story

বা

ফ্যানের তলায় বসে , খুচরো চুলগুলোকে পিছনের দিকে সরিয়ে দুপুরের নীরবতাকে দিব্যি উপভোগ করেছিলো আলো । পর্দাগুলোকে অবশ্য সরিয়ে ঘরটাকে একটু অন্ধকার করে দিয়েছে, যদি একটু ঘুম জড়িয়ে আসে চোখে সেই ভেবে । আজকাল ঘুমটা একটু কম ই হচ্ছে, বয়সজনিত দোষে হয়তো । তাই উট-পাটকেল না ভেবে যখনি ঘুম আসে ,নিশ্চিন্তে তার আরাধনা করে নেয় সে ।একা একা থাকার এইটা একটা বিরাট লাভ , কেউ সহজে ডিসটার্ব করতে পারে না ।দুই ছেলে দূরদেশে, মাঝে মাঝে ফোনে যোগাযোগ মনে করিয়ে দেয় তাদের অস্তিত্ব আর স্বামীর পেনশনের টাকায় আলোর নিশ্চিন্ত জীবন । সবাই ই তো তাই চেয়েছিলো , আলো ও কি চেয়েছিলো এই রকম জীবন ? চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকলো সে……………………….

বিয়ের সময় প্রফেসর বর জুটেছিল নিজের শহরেই , বেশি দূর কাঁদতে কাঁদতে যেতে হয়নি তাকে বাপের বাড়ি ছেড়ে । পরীক্ষা যদিও আগেই দিয়েছিলো , কিন্তু বিয়ের পর ই চাকরিটা পেলো , প্রাইমারি স্কুলের দিদিমনি । বাচ্ছাদের ভালো লাগতো বলে , এই চাকরিটাই ছিল তার পছন্দের । বাড়ির কাজ সেরে, কর্তব্য সামলে কষ্ট হলে ও সে চালিয়ে যাচ্ছিলো তার চাকরি ।পরিবারে নতুন অতিথির আগমনের পর সকলেরই চোখ গেলো ওই চাকরির দিকে ।

বর বললো , ” আমি যা উপায় করছি , চলে যাবে । দরকারে টুইসন নেবো বেশি বেশি ।তাছাড়া আমার সকলকে বলতে লজ্জা করে তুমি প্রাইমারি স্কুলে পড়াও । এখন তো এই কারণ দেখিয়ে ছেড়ে দিতে পারো ।”
শাশুড়ি বললো , ” বৌমা , ভারী তো চাকরির ছিরি , আমি আর তোমার ছেলেকে দেখতে পারবো না ।ছেড়ে দিয়ে বাড়ি সামলাও “।
মা-বাবা বললো , ” শশুড়বাড়ির লোকের কথা শুনে নে , অশান্তি টেনে আনিস না । পরে আমরা আশ্রয় দিতে পারবো না ।”
আলো চোখে অন্ধকার দেখছিলো না , মনে দেখছিলো , নিজের না , অন্য সকলেরটা ।

***************************

জীবন এগিয়ে চললো জীবনের খাতে , শাশুড়ির মৃত্যু , আর একজন নতুন অতিথি , তাদের স্কুল-পড়াশুনা শেখানো , চাকরি-বিয়ে ,স্বামীর মৃত্যু সবকিছুই আলোকে অনেক পরিণত করে দিয়ে গেছে । বাহান্ন বছর বয়সে তিনটে ঘর, ডাইনিং, রান্নাঘর, বাগান দিয়ে ঘেরা ছোট্ট বাড়িতে সে যখন একা থাকতে শুরু করলো , আত্মীয়রা সবাই পরামর্শ দিলো বৃদ্ধাশ্রমে চলে যেতে । আলো মুচকি হেসেছিলো , আসলে তারা ও তো জানে না আলোর অন্ধকারময় জায়গাটা । উল্টে কাজের লোক , রান্নার লোক রেখে আলো নিজের বাড়িতেই গুছিয়ে বসলো ।

নতুন রাখা রান্নার মেয়েটাকে আলোর খুব পছন্দের । রান্না খুব মন দিয়ে করে , ভয়ে ভয়ে থাকে যাতে ছাড়িয়ে না দেয় কারণ ওই টাকাতে সে ছেলেকে টুইসন পড়ায় । একদিন দেখে সে রান্না করছে আর চোখের জল মুছে চলেছে । আলো অনেক্ষন ই দেখলো , শেষে নিজেই জিজ্ঞাসা করলো ।
” কাকিমা , ছেলেটাকে তো মাস্টারের কাছে দিয়েছি পড়তে , তার পর ও ফেল করলো এই ক্লাসে । কি যে করবো বুঝতে পারছিনা “।
আলো বললো , ” ওহ , এই ব্যাপার , একবার তোর ছেলেকে নিয়ে আসিস ।কোন ক্লাসে পরে যেন ?”
” কাকিমা , ওই সেভেনে উঠতো , আর এখন ই ফেল করলো ।”
” আচ্ছা, কালকেই নিয়ে আসিস , আর কিছু বই পত্র ও আনতে বলিস সাথে ।”
“হ্যাঁ , তাই বলবো । কিন্তু কি জন্য বলছেন কাকিমা ?”
” আমি একটু দেখিয়ে দিতে পারি কি না দেখবো , আমিও একসময় দিদিমনি ছিলাম রে ।”
পরের দিন ছেলেটি এলো আলোর কাছে , বস্তিতে থাকা , ভয়ে কোঁকড়ানো ,দুর্বল মনের একটা ছেলে । আলো একটু কিছুক্ষন নানা প্রশ্ন করে বুঝে ফেললো গলদ কোথায় । অন্য সব শিক্ষকরা যা পড়িয়েছে তা ওর মনে আছে কিন্তু সেগুলো কি করে প্রয়োগ করতে হয় তা তার মাথাতেই ঢোকেনি । আসলে তাকে বোধহয় কেউ বলেই নি , ” পড়া ” আর ” শেখার ” মধ্যে পার্থক্যটা ঠিক কোথায় । যাই হোক , আলো অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে বেশ চৌখস করে তুললো । পরের ক্লাস গুলোও সে টপাটপ পাশ করতে থাকলো । তার মা ও হাসি মুখে রান্না করতে থাকলো ।

***************************

কিন্তু আলো অনেক কিছু ভাবতে থাকলো , এই ছোট্ট ছেলেটার হাত ধরে সে যেন একটা চাবি খুঁজে পেলো । তার স্বপ্নের দরোজার চাবি যেটা সে এতদিন হাতড়ে খুঁজে যাচ্ছিলো ।
খুঁজে চললো আরো বন্ধ দরজা গুলো , রাস্তার ঝাড়ুদার, লন্ড্রির লোকটা , যে দুধ দিতে আসে , পাহারাদার , সকলের দরোজায় ঘা দিতে লাগলো সে । আকুতি নিয়ে বললো , ” যদি তোমাদের বাড়িতে ছেলে-মেয়ে থাকে , পাঠাও না আমার কাছে , আমি পড়াবো , না -না , টাকা-পয়সা দিতে হবে না , শুধু শেখাতে চাই যা তাদের কাজে লাগবে ।” আলোর এই আগ বাড়িয়ে বলা যেন তাদের ঠিক বিশ্বাস হলো না , তখন পাশে পেলো লক্ষীকে , রান্নার মেয়েকে । সে ও তাদের বাড়ি গিয়ে বলে এলো কি চমৎকার করে গড়ে উঠছে তার ছেলে । এতে কাজ হলো , এক এক করে অনেকেই এসে জড়ো হলো আলোর কোলে ।

**********************************

আলো দেখলো , ছেলে-মেয়েগুলোর মধ্যে জানার কি অসীম আগ্রহ , শেখার কি তীব্র চেষ্টা ।নিজের ঘরের ফার্নিচার সরিয়ে তার ছোট্ট ক্লাসরুম বড়ো করে নিলো সে , এমনকি আরো একটা ঘর ও রাখলো তাদের হোমওয়ার্ক করার জন্য । বস্তির সেই ছোট্ট দশ ফুটের ঘরে সাতজন মিলে থাকতে থাকতে যে পড়াশোনা টাই হয়না ঠিকমতো , এটা আলো বুঝে ফেলেছে । মাঝে মাঝে তাদের সাথে পড়াশুনা বন্ধ রেখে গল্পে মেতে উঠতো সে । গল্পের বিষয় হতো , তাদের স্বপ্ন গুলো ঠিক কি সেটা বোঝা ।

শুধু তাই নয় , আলো শেখাতো বাস্তব জীবনের শিক্ষা , কেমন করে কারোর সাথে কথা বলতে হয় , বুদ্ধি দিয়ে যাচাই করতে হয় ,নম্র হয়ে কি কি মেনে চলতে হয় এইসব টুকিটাকি । একটা ছেলেতো তার কাছ ছাড়া হতেই চাইতো না । বাবা দর্জি , দিনের আয় ছিল একশো টাকা আর সে ও স্বপ্ন দেখতো বড়ো হয়ে বাবার মতোই দর্জি হবে । আলো হাসতো তার মনের সততায় , বোঝাতো, কেন সে অন্য রকম কিছু করবে না । নামটি ও বেশ ছিল মনে আছে আলোর, সুমন , এখন আইটি ফার্মে কাজ করছে ।সেদিন ফোন করে বললো , আসবে দেখা করতে , জানালো , বুটিক খোলার চেষ্টা করছে সে ।আলো তো খুব খুশি হলো ।
এমনি করে , আলোর স্কুলে সেই একজন থেকে শুরু হয়ে ত্রিশজনে পৌঁছেছিল ।আর সকলের কাছে সে ছিল প্রিয়” বা “মানে ঠাকুমা ।প্রায় আট বছর চালানোর পর , শরীর জবাব দিলো প্রথমবার হার্টএটাক করিয়ে ।

*******************************

আলোর মুখে হঠাৎ একটু হাসি খেলে গেলো , মনে পরে গেলো সেই দিঘা বেড়ানোর কথাটা । বছরে একবার ছেলেগুলোকে নিয়ে এক-দু দিন একটু ঘুরে আসতো আশেপাশে । প্রথম সমুদ্র দেখার ভালোলাগা-আতঙ্ক -বিস্ময় সব মাখামাখি করে ছেলে মেয়েদের মুখগুলো ছিল বাঁধিয়ে রাখার মতো । আর আলো সেইদিন সমুদ্রের পাশে বসে ঈশ্বরকে অনেক ধন্যবাদ দিয়েছিলো । ধন্যবাদ দিচ্ছিলো ,যে তার ছোট্ট শুরু আর হৃদয় ভর্তি স্বপ্নের সাথ দেবার জন্য |
এতসবের পরে আলোর আর কিছুই চাওয়া-পাওয়ার বাকি নেই । শুধু মাঝে মাঝেই মনে হয় , এমনি সব স্মৃতি ঘাঁটতে ঘাঁটতে যদি একেবারে অতলে তলিয়ে যায় , তবে বেশ হয় । চোখে বেশ ঘুম জড়িয়ে আসছে , বুঝতে পারছে সে ,মুখ একপাশে হেলে গেলো । আবছা শুনতে পাচ্ছে , বাইরে কেউ কোলিং বেল বাজাছে ,আলো উঠে যেতে চেষ্টা করলেও পারছে না ,শরীরটা যে নিথর এখন ।

Tagged , , ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →