mythology, story

আধুনিকা

আমি জানি আমার নামটা তোমরা সবাই জান ,তাহলে থাক , এখনি আর বলছি না । বরং অন্য কিছু বলি ,মানে আমার জীবনের নানা কথা বলি , কেমন ? আসলে নামটা জেনে গেলে গল্পটা আর আমার মত করে বলা হবে না । এমনিতেই তোমরা আজকের দিনে কেউ ই আমার মত হতে চাও না , নাম জেনে গেলে হয়ত আর লেখাটাও পড়বে না ।

জানো, আমার জন্মটা একেবারেই অন্যরকম হয়েছিল ,মায়ের কোল চিঁড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম,বাবা আনন্দে কোলে তুলে নিয়েছিলেন । বেশ উঁচু ঘরেই জন্ম , বোনেদের নিয়ে খেলতে খেলতে কেমন করে যেন শিশু থেকে কিশোরী হয়ে উঠলাম নিজেই বুঝেতে পারিনি । কষ্ট যে কি জিনিস, তা কেমন হয় , তখন কিছু জানতাম ই না । বিয়ের বয়স হতেই বাবা সব থেকে ভাল পাত্রের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেন । আনন্দের কথা, আমরা সব বোন মিলে একটাই শ্বশুরবাড়ি পেলাম । কি মজা, সবাই এক সাথে থাকব ।

বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই সবকিছু যেন গোলমাল হয়ে গেল । ভাল স্বভাবের বর , বাবাকে দেয়া কথা রাখতে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লো । সাথে আর কেউ নেই , আমি কিং কর্তব্য বিমুরহ , শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম স্বামির সাথেই যাবো । বাড়ির বড়রা কত করে বোঝাল, এমনকি বাড়ির যিনি গুরুদেব তিনিও এলেন আমাকে বোঝাতে কিন্তু আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম কি করবো তাই কেউ আর আমার মন টলাতে পারেনি । আসলে নিজের বিবেক তো জানত যে স্ত্রীর কর্তব্য হল স্বামিকে অনুসরন করা,আমি তাই ই করেছিলাম ।

বাড়ির বাইরে মেয়েদের জন্য পদে পদে বিপদ ,আমিও সেই রকম ই এক বিপদে পরলাম । স্বামির প্রতি আকৃষ্ট এক মেয়ের দাদা প্রতিশোধ নিতে এক প্ল্যান করে , ঐ এখনকার দিনের ব্লাক ম্যাজিকের মত আর কি । প্রিয়জনের সতর্কতা উপেক্ষা করে গণ্ডী পেরিয়েছিলাম সেই ছদ্মবেশী দাদাকে ভিক্ষা দিতে । আমি অপহ্রিতা হলাম, কারন সেই সময় নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে সাহায্য করতে গিয়েছিলাম । সারথপর না হয়ে পরার্থে কাজ করেছিলাম ।

এরপরের ঘটনা গুলো শুধু যেন ঘটেই চলল ,আর আমি রইলাম দর্শক হয়ে তবে সবাক , নীরব না । উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে , আমাকে যে পথে অপহরন করে নিয়ে গিয়েছিল সেই রাস্তায় নিজের নানা গয়না-গাঁটি ফেলতে ফেলতে গিয়েছিলাম যাতে আমার স্বামী আমাকে সহজেই খুঁজে পায় । তারা ও চেষ্টা করে পেয়েছিল আমার খোঁজ । দূরে যেখানে আমাকে বন্দি করে রেখেছিল , সেখানে স্বামীর লোক গিয়ে হাজির হয়েছিলো । লোক না বলে ভক্ত বলাই ভাল , সে তো তক্ষুনি আমাকে নিয়ে আসার জন্য তৈরি কিন্তু আমি মানা করলাম । আমি বুঝেছিলাম , স্বামীর ই কর্তব্য হল স্ত্রীকে উদ্ধার করা তাই আমি অপেক্ষা করেছিলাম কখন তিনি সেই দায়িত্ব পালন করবেন তার জন্য ।

স্বামীর বিরত্বে গর্ব করার সময় পেলাম না যখন আমারই পরীক্ষা দেবার সময় হয়ে গেল , যেসে পরীক্ষা নয় ,একেবারে অগ্নিপরীক্ষা । আমি দিতে রাজীও হয়ে গেলাম,তোমরা অনেকে হয়ত এর জন্য আমাকে অপরাধী ভাববে কিন্তু ভেবে দেখছ কি আমার কি সাহস ,কত আত্মবিশ্বাস ,কত নিরভিমান আর কতটা সত্য নিষ্ঠা । আমার যে মন-মুখ এক তাই তো এগিয়ে গিয়েছিলাম ওমনি ।

কি হল , এখন নিশ্চয় আমার নামটা বুঝতেই পারছ । কিন্তু তবুও না বুঝতে পার তো এখনো গল্পের যা বাকি আছে তা যদি বলি তবে সহজেই বুঝে যাবে । ইতিহাসে আমি ই প্রথম যে একা একা ছেলেদেরকে মানুষ করেছে , ঐ যে তোমরা যাকে সিঙ্গেল প্যারেন্ট বল , ঠিক তাই । তবে তার পিছনে কি কারন ছিল সেটা আর এখন বলছি না । স্বামীর কাছে দূরে থেকেও তাদের সেরকমই বড় করেছিলাম যেরকম বাবার বংশে হত । শিক্ষায়- দীক্ষায় , অস্ত্রবিদ্যায় , শাস্ত্র পাঠে , সহবতে , সবেতেই তাদের পারদর্শী করে তুলেছিলাম ।

ছেলেরা দুজনে যখন পিতার অশ্ব মেধের ঘোড়া আটকাল , তখন পিতা এসেও যুদ্ধে তাদের হারাতে পারলো না । শেষে যখন ব্রহ্মাস্ত্র দিয়ে মারতে গেল, তখন আমি এসে আটকালাম । পরিচয় করিয়ে দিলাম পিতার সাথে সন্তানদের । পরিচয় পেয়ে তিনি পুত্রদের নিয়ে যেতে চাইলেন সাথে , সঙ্গে আমাকেও । না, আমি যাইনি এই সময় , ছেলেদের অবশ্য পাঠিয়ে দিয়েছিলাম । আসলে ভেবেছিলাম তাদের তো রাজধর্ম শিখতে হবে কিন্তু আমার তো আত্মসম্মান বোধ আছে ।

ছেলে দুটো চলে গেলো , আমি রয়ে গেলাম একাকী বনবাসে । একসময়ের মহারানী ,পরে রইলাম গৈরিক বসন । স্বামীকে ভালবাসি কিন্তু তার থেকেও বেশি প্রিয় ছিল বাক্তি স্বাতন্ত্র্য । কোন চাহিদা ছাড়াই শুধু কর্তব্য করে গেছি সারাজীবন । তোমরা কি কেউ পারবে এখনকার দিনে ? একাকী নিজের শর্তে বেঁচেছি ।

নিজের অবমাননা আটকাতে যখন মৃত্যু কে বরন করে নিয়েছিলাম , সবাই যখন বিষ্ণু লোক- শিব লোক যেতে চায় , তখন আমি বেছে নিয়েছিলাম মায়ের কোল । ধরিত্রি মাতা আমার , মাটির কন্যা আমি তাইতো আমার কাছে জন্মভুমি স্বর্গের থেকেও দামি ছিল । সারাজীবন আমি রানী হয়ে থেকেছি কিন্তু সম্রাগ্যির মত দিয়েছি ।

আচ্ছা, এবার বলতো তোমরা, কে যুগের থেকে অনেক এগিয়ে ছিল ? যুগের থেকে যে এগিয়ে থাকে তাকেই তো তোমরা আধুনিকা বল , তাই তো । তাহলে আমার থেকে বড় কোনও আধুনিকা আছে কি ? আমি কে ? তোমাদের চেনাজানা সেই দুঃখিনী সীতা গো ।

Tagged , , ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →