my stories

বীরত্ব

কাছাকাছি সময়েই সরস্বতী পূজা চলে গেলো , ধূলি ঝড়ের হাওয়ার মতো যেন একটু ঘেঁটে দিয়ে গেলো আমাকে । ঠিক আমাকে নয় , মানে আমার স্মৃতিকে বিশেষ করে ছেলেবেলার স্মৃতিকে । আর ছেলেবেলা মানেই ভাই , ভাই ছাড়া যে গল্পটাই অন্ধকার সেটা পড়লেই বুঝতে পারবে । পূজার সময় কেমন প্যান্ডেল করতে হবে , কোথা থেকে গমের শিস, কুলের জোড়া, আমের মুকুল জোগাড় করতে হবে সেসব ই ছিল ওর নখদর্পনে । জানি না স্কুল আসা-যাওয়ার ফাঁকে কেমন করে সব নজর করে রাখতো ! আমি অবাকই হতাম কারণ ওই একই রাস্তায় আমি ও যেতাম কিন্তু কোনোদিন ই যেন দেখতে পাইনি । এছাড়াও ওর কাজ ছিল পূজার আগে , বাড়িতে থাকা মাটির মূর্তিটিকে সুন্দর করে রং করে , চোখ-মুখ এঁকে একেবারে নতুন করে তোলা ।

তা এই আমার থেকে মাত্র এক বছরের ছোট ভাইটি কে নিয়েই ছিল আমার ছেলেবেলা ।কিন্তু একটু মাত্র বয়সে বড়ো হলে কি হবে , আমি কর্তাত্বি করতে মোটেই পিছু হাটতাম না । ওই বয়সেই মানে তখন আর কত ওই নয়-দশ বছর বয়সেই ভাইকে ঠিকঠাক মানুষ করাই ছিল যেন আমার কাজ । ভাই ও কিন্তু তেমন ই বাধ্য ছিল , অন্য অনেকে হয়তো কথাই শুনতো না কিন্তু ও বেশ ভয় ই পেতো আমার নজরদারিকে । প্রমান ? দিচ্ছি , দিচ্ছি

আসলে আমি আর ভাই একই স্কুলে পড়তাম তাই বলাযায় , ” এক্সটেন্ডেড ছেলেবেলা ” । যাই হোক ,কোনো একদিন জ্বর হওয়াতে স্কুলে গেলাম না , ভাইকে একাই যেতে হোলো । ভাইয়ের যাতে খারাপ না লাগে তাই মা ওকে টিফিনে কিছু কিনে খাবার জন্য টাকা দিলো । স্কুল ফেরত হাসি-খুশি ভাই আমার জন্য একটা ছোট্ট প্যাকেটে আচার চকোলেট নিয়ে এলো ।
জ্বর মুখে আমার খেতে মন্দ লাগলো না । মা জিজ্ঞাসা করলো , কি কি কিনলি , কটা কিনলি । ভাই জানালো মাত্র দুটোই কিনেছে , একটা খেয়েছে আর একটা আমার জন্য নিয়ে এসেছে । সব্বাই ভাইকে খুব আদর করলো তাই ,এই রকম যত্ন নেয়ার জন্য ।

পরেরদিন আমি স্কুলে গেলাম , আমার টিকটিকি বন্ধু গুলো আমাকে খবর দিলো , ” জানিস তোর ভাই কালকে কতগুলো যে আচার চকোলেট কিনেছিলো ! বন্ধুদের দিয়েছে আর নিজে তো মুড়ির মতো খেয়েছে ।” বাড়ি এসে ছোট্ট ঘটনাটা ফাঁস করে দিতেই ভাই পলকের মধ্যে উধাও হয়ে গিয়েছিলো । নজরদারির এমনি মহিমা ।

এহেন নজরদারিতে ভাইকে বেশ ঝিমিয়েই থাকতে হতো , কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলে তো তাই কখনো কখনো তার পুরুষালি বীরত্ব মাথা চাগিয়ে ওঠার চেষ্টা করতো । একটা সুযোগ এসে গেলো আর সেদিন ও আমি কিছু একটা কারণে স্কুলে যাইনি । স্কুলে আবার সেদিন কিছু ভ্যাকসিনেশনের দিন ছিল । ভাইকে স্কুলে পাঠিয়ে বাড়িতে সবাই চিন্তায় অধীর , নেবে তো ? নিতে পারবে তো ? জ্বর আসবে না তো ? এমনি সব কথাবার্তা সারাদিন চলছিল । বিকালের দিকে ভাই ফিরলো হাসতে হাসতে , যেন কিছুই হয়নি ।

মা-কাকু-ঠাকুমা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লো প্রশ্নবাণ নিয়ে । নিয়েছিস ? কোথায় নিলি ? কেমন করে নিলি ? লাগে নিতো ? এতসব প্রশ্নের উত্তরে ভাই হাসি মুখে জানালো , ” কি আর ব্যাপার , নিলাম , কিছুই লাগেনি ,ওই একটু পিঁপড়ে কামড়ানোর মতো ” । এরপর মায়ের বিশেষ আদর দিয়ে করে রাখা খাবারটা খেয়ে ও চলে গেলো খেলতে । বাড়িতে তখন এক প্রস্থ কথা বার্তা শুরু , ” ছেলেটার সহ্যশক্তি আছে গো মা , ” ঠাকুমা বললো । মা আমাকে বললো , ” তুই হলে ভয়েই মরতিস ।”কাকু বললো , ” ভালো ফিট ও তো রয়েছে , খেলতে গেলো ।” আমি ও যেন খুশি হবার খুব চেষ্টা করছিলাম , ভাবছিলাম ছোট্ট ভাইটা বেশ সাহসী হয়ে গেছে ।

পরের দিন আমি গেলাম স্কুলে , গল্প করলাম আমার ভাইয়ের বীরত্ব নিয়েবন্ধুদের কাছে । তা সেই টিকটিকি বন্ধু গুলো এবার আকাশ থেকে পড়লো , বললো ” তুই তো কাল আসিস নি , তবে এইসব কোথায় জানলি ?” বললাম , ” কেন ভাই ই তো বললো ” । এবার ওদের গড়াগড়ি দিয়ে হাসার পালা , বললো , ” তোর ভাই কালকে ওই ছুঁচ ফোটানোর ভয়ে দৌড়াদৌড়ি করে স্কুলের এক সিঁড়ি দিয়ে নেমেছে আর এক সিঁড়ি দিয়ে উঠেছে , কেউ ওকে ধরতে পারেনি ।” আমি হতভম্ব , চক্ষু ছানাবড়া আর আমার ভাইয়ের বীরত্ব ?
বাড়ি ফিরে অনেক প্রশ্নবাণ আর হাসাহাসির সামনে ভুলন্ঠিত । চোখ নামিয়ে , মুখ নিচু করে সেই মুহূর্তটাকে ভাই কিন্তু সুন্দর করে সামলে নিয়েছিল , আসল বীরত্ব বোধহয় সেটাই ছিল ।

Tagged , ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →