gypsy mind

বিশ্বনাথ যাত্রা

কলকাতার বিখ্যাত জ্যাম থেকে তিন ঘন্টা পর ছাড়া পেয়ে যখন হাওড়া স্টেশনে পৌঁছালাম, ডিসপ্লেতে দেখলাম ট্রেন চল্লিশ মিনিট লেট| হাঁফ ছাড়লাম, যাক একটু পেটে কিছু দেয়ার সময় পাওয়া গেলো| রাত তখন দশটা, পাশের দোকান গুলোয় খাবার প্রায় শেষ বললেই চলে| একটা জায়গায় লুচি-সবজি পাওয়া গেলো আর সেটা খেয়ে জলের বোতল নিয়ে ট্রেনের কাছে আসতেই দেখা গেলো ট্রেন ঠিক সময়ে| সবাই উঠে পড়েছে| অবাক হবো সময় নেই, টিকেট নিয়ে ছুট লাগানো হলো কোন কোচটা আমাদের তা দেখতে| টিটিকে জিজ্ঞাসা করেও সে বলতে পারলো না| দেখতে দেখতেই ট্রেন ছেড়ে দিলো| আমরাও প্রায় দৌড়ে লাগেজ নিয়ে একটা কামরায় উঠে পড়লাম| উঠে হাঁফাতে হাঁফাতে দেখা গেলো ভাগ্যক্রমে সেই কোচেই আমাদের টিকিট| সত্যি, এমনও হয়| মনে মনে বাবা বিশ্বনাথকে প্রণাম জানালাম|

কলকাতা থেকে কাশী বা বারাণসী যাওয়া এমন কিছু কষ্টকর না| এক রাতের জার্নি, রাত্রের ঘুমের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় জ্যোতির্লিঙ্গ গুলোর শ্রেষ্ঠ ধামে| সকাল ৮ টায় নেমে পড়া হলো মোগলসরাই স্টেশনে| এই স্টেশনটা বেশ বড়োসড়ো আর দিল্লী,মুম্বাই যাবার বেশিরভাগ ট্রেনইএখানে থামে| স্টেশনের বাইরে অটোরিকশা বা ট্যাক্সি পাওয়া যায় হোটেল নিয়ে যেতে| আধুনিক আপের সাহায্য নিয়ে আমরা ক্যাব বুক করে হোটেল চললাম| যাবার রাস্তায় গঙ্গা পার হয়ে এলাম| মনে মনে ভাবলাম এই কি সেই গঙ্গা যাকে আমরা বাড়ির কাছে দক্ষিনেশ্বরেও দেখি|

বারাণসী, লখনৌয়ের পরে দ্বিতীয় বড়ো শহর,আর প্রাচীনতম শহর| হয়তো বা ৫০০০ বছর আগের| ইতিহাসের থেকেও প্রাচীন কিন্তু প্রায় সকল ধর্মের কাছেই প্রিয় স্থান| কি জৈন, কি বৌদ্ধ, কি হিন্দু, কি মুসলিম সকলেরই ঐতিহ্য জুড়ে আছে কাশী| গঙ্গার পাড়ে অবস্থিত হলেও অসি যদি আর বরুনা নদীর সঙ্গম স্থলের ৪ কিমি জুড়ে এই শহরের বিস্তার| আর দুই নদীর নামের ভগ্নাংশেই জায়গার নাম, বারাণসী| পুরান অনুসরণ করলে বলা যায় সময়েরও আগে দেবাদিদেব মহাদেব আর দেবী পার্বতীর নিজের হাতে তৈরী এই জায়গা |

অলি-গলি পার হয়ে যখন হোটেলের কাছে একঘন্টা পর পৌঁছালাম, ক্যাব ড্রাইভারের ড্রাইভিং করার তারিফ না করে পারলাম না| জানা গেলো সকাল বেলা বলে নাকি এতো অল্প সময় লাগলো, অন্য সময় ওই রাস্তা দিয়ে আসতে হয়তো সারাদিনই লেগে যেত| আমাদের হাতে কাশী ঘোরার জন্য মাত্র দুদিনই বরাদ্দ ছিল| তাই হোটেলে পৌঁছে সময় নষ্ট না করেই বেরিয়ে পড়লাম ঘুরতে| অটোরিকশা করে ঘুরতে ৪-৫ ঘন্টা সময় লাগবে| তারপর আমরা দেখবো গঙ্গা আরতি সন্ধে বেলায় আর বাবা বিশ্বনাথের দর্শন আর গঙ্গা স্নানের জন্য রেখে দিলাম পরের দিনটা|
প্রথমেই গেলাম গঙ্গা ঘাট দর্শনের জন্য|

হোটেলের কাছে ছিল হরিশ্চন্দ্র ঘাট ,পাশেরটা কেদার ঘাট| রামায়ণের দাতা হরিশচন্দ্রের নামে এই ঘাট| ঋষি বিশ্বামিত্রের কাছে রাজ্যপাট,ধনদৌলত দান করে এই ঘটে তিনি দাহকার্য্য করে জীবিকা নির্বাহ করতেন| এমনকি নিজের সন্তানের দাহকার্য্য করতেও হাত কাঁপে নি আর তখনি তিনি ঋষির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন| এখনো সেখানে মৃতদেহ দাহ হতে দেখা গেলো| কাশীতে মরলেই মুক্তি, আর কোনো জন্ম হবে না এই বিশ্বাস নিয়ে বয়স্ক মানুষেরা আজও জীবনের শেষ দিনগুলোয় এখানে এসেই মরতে চায়| তাদের জন্য এখানে থাকার জায়গা ও আছে, তার নাকি বুকিং করার ব্যবস্থা থাকে| আর মৃত্যুর সাথে সাথে জীবনকেও চলতে হয় তাই আসে পাশে চায়ের গুমটি, জলের বোতলের দোকান, কাঠের দোকান সবই রয়েছে ব্যবসা করে জন্য|কেদার ঘাট বিখ্যাত কেদারেশ্বর মহাদেবের জন্য আর মা সারদার প্রিয় জায়গা| এখানে ঘাটটিও খুব মনের মতো| ঠিক করলাম কাল এখানেই স্নান করবো|মেয়েদের জন্য জামা-কাপড় ছাড়ার ব্যবস্থা রয়েছে| আজকে মাথায় গঙ্গা বারি ছিটিয়ে চললাম
কাল ভৈরবের দর্শন করতে|

কাল ভৈরবকে বলা হয় কাশীর কোতোয়াল, এখানকার রক্ষাকর্তা তিনি| তাকে আগে দর্শন করে বিশ্বনাথকে দর্শন করতে হয়| পুরানে কথিত আছে
ভগবান শিবের রুদ্র মূর্তি হলো কাল ভৈরব| এমনকি ভগবান ব্রহ্মার পাঁচ মাথা থেকে চার মাথা হওয়ার পিছনেও তিনি| আর সেই কাটা মাথা নিয়ে, ব্রহ্ম হত্যার দায় নিয়ে ত্রিভুবন ভ্রমণ করেও হাত থেকে মাথা নামাতে পারলেন না| শেষে কাশী যখন এলেন তখন আপনা আপনি হাত থেকে মাথা খসে পড়লো|সেই থেকে এখানে তিনি বিরাজমান| গেরুয়া রঙের মন্দিরে সত্যি ভয়ংকর কাল ভৈরবের মূর্তি| চোখের দৃষ্টির তেজ যেন সূর্য রশ্মির মতো শক্তিময়| এখানে ভগবানের পুজোয় দেয়া হয় সুরা|

এরপর আমরা একে একে দেখলাম সংকট মোচন হনুমান মন্দির, মা দূর্গা মন্দির আর তুলসী মানাস মন্দির| বাকি দুই মন্দির অনন্য সব জায়গার মতো লাগলেও শেষের মন্দিরটি কিন্তু সত্যি অনন্যরকম| ১৯৬৪ এ তৈরী সাদা মার্বেল পাথরের এই মন্দির ভগবান রাম কে উৎসর্গ করা হয়েছে| তুলসীদাস রামায়ণ পুরোটা এই মন্দিরের গায়ে পাথরের উপর লেখা| সন্ধ্যা সূর্য অস্তমিত হবার পথে তাই দেরি না করে চলে এলাম দশাশ্বমেধ ঘাটে যেখানে হবে কাশীর বিখ্যাত সন্ধ্যারতি|

অঘ্রানের শান্ত বিকালে মা গঙ্গার কুলকুল করে বয়ে যাওয়া, নানারকম বোটের আনাগোনা,লোকজনদের স্নান করা, আসা-যাওয়া,গঙ্গায় দীপ ভাসানো,তারই মাঝে সাধুদের নির্লিপ্ত হয়ে বসে থাকা, দূরে মণিকর্ণিকা ঘাটের দাহকার্যের ধোঁয়া, এই সব কিছু নিয়ে বারাণসী যেন তখন এই জগতের বাইরে এক অদ্ভুত জগৎ-সংসার| মায়াময় অথচ মায়াহীন|পূর্ণিমার সন্ধ্যে ছিল তাই ঘাটগুলো আরতির জন্য একটু বেশি করেই সাজানো ছিল| অনেকে ভালো করে দেখতে পাবে বলে বোট ভাড়া করে নদীবক্ষে চলে গেলো| আমরা সামনে থেকেই দেখলাম| প্রায় এক ঘন্টা ধরে ভজন-বন্দনা সহযোগে গঙ্গা মায়ের আরতি হলো| পাশের মণিকর্ণিকা ঘাটেও একই সাথে আরতি হয়| দেখার লোকজনের ভিড় খুব তাই একটু একটু আগে গেলে বসার জায়গা পাওয়া যায় |

প্রসাদ নিয়ে যখন হোটেলের পথে পা বাড়ালাম আজকের মতো শরীর জবাব দিচ্ছিলো| রিকশা করে কাশী বিশ্বনাথ লেন দিয়ে আসার পথে দেখলাম লোভনীয় খাবারের দোকান,বেনারসির দোকান| খুব যে কিনতে হচ্ছিলো তা নয়,এসেছি শুধু বাবা বিশ্বনাথের টানে তাই তাঁর দর্শন না করা পর্যন্ত মনটা এখনো ভরেনি| কাল ভোরে উঠেই ছুটবো বাবার কাছে| জয় বাবা বিশ্বনাথ|

Tagged , , ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →