story

বিয়োগ

মধ্যবিত্ত পরিবারে বড়ো হওয়া সুমন নিজের চেষ্টায় চলে এসেছে অস্ট্রেলিয়া , না চাকরি না, পড়াশুনা করতে | আপাতত তিন বছরের জন্য থাকতে হবে ডিগ্রি পেতে, পরে এখানেই চাকরি পেয়ে গেলে করবে, সেই ইচ্ছাই রাখে | সত্যি এখানে পড়াশুনার সময়টা বেশ কঠিন | তবু এসে গেছে যখন, দাঁতে দাঁত চেপেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে | বাবা-মা, কাকু-কাকিমা, তুতো ভাই-বোন সবাইকে ছেড়ে এসে এখানে একা একা থাকাটা বেশ মনোকষ্ট দেয় | আরো যাকে ও খুব গভীরভাবে মিস করে সে হলো ওর দাদু |

আজকেই সকালে যেমন ওর ঘুমটা কেমন করে যেন ভেঙে গেলো , মনে হলো দাদু ডাকলো তাকে | চোখ খুলে দেখে কেউ কোথাও নেই | তার মনে হলো এখুনি ফ্লাইটের টিকিট কেটে একবার দাদুকে দেখে আসে | কিন্তু উপায় নেই | চোখে জল এসে গেলো | আচ্ছা, একটু পরে না হয় ফোনে কথা বলে নেবে | কিন্তু সুমন যথারীতি ব্যস্ত হয়ে ভুলে গেলো ফোনের কথা তবে টুকরো টুকরো করে দাদুর মুখটা ওর চোখের সামনে ভাসলো সারাদিন ধরেই |

পরিবারে সবাই যখন কাজে ব্যস্ত, দৈনিক রুটিন মতো চাকরি, বাজার-হাট এসবের মধ্যে সময় নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে ,সুমনের সঙ্গী তখন দাদু | সেই টলোমলো পায়ে হাঁটা থেকে, কিন্ডারগার্টেন স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসা , সাইকেল চালানো শেখানো সবকিছুতেই ছিল দাদুর ছোঁয়া | বাবা- মা সঙ্গ সে পেতো রাতের খাবার টেবিলে | দাদুই তাকে পাশে বসে শুনিয়েছে মহাভারতের কত রকমের গল্প , একটি একটি করে চিনিয়েছে আকাশের তারা |তার যে গীতার শ্লোকগুলো সব মুখস্থ , তার কারণ দাদু | সকালে উঠে যে এখনো প্রতিদিন যোগ ব্যায়াম করে তার ও পিছনে সেই দাদু | মনে পরে তার সেই আশি বছরের কর্মঠ দাদু যখন পা স্লিপ করে পরে যায় তার পর দাদুর মনের অবস্থা কি হয়েছিল | প্রায় পাঁচ বছর আগের ঘটনা | সম্ভবত হার্ট স্ট্রোক হয়েছিল দাদুর |ডাক্তার যদিও দাদুকে সান্ত্বনা দিয়েছিলো সব ঠিক হয়ে যাবে | কিন্তু শক্ত মনের দাদুও কেমন দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো যখন হুইল চেয়ারে বসে দাদুকে ঘুরতে হতো | সুমন ই ছিল দাদুর দেখভালের জন্য | যদিও আরো অন্য লোক ছিল কিন্তু দাদুর মনে সাহস দিতে তার ভালো লাগতো | কখনো অবশ্য নিজেও দাদুর আড়ালে একটু কেঁদে ফেলতো দাদুর অসহায় অবস্থা দেখে |

যাই হোক দাদুকে বুঝিয়ে মনের জোর বাড়িয়ে একদিন হাতে লাঠি দিয়ে হাঁটানোর চেষ্টা করলো সে আর সফল ও হলো | কিন্তু এই পুরো ঘটনায় স্মৃতিধর দাদু কেমন যেন সব কিছু ভুলতে বসেছিল | তাদের ভাই-বোনদের নাম, তারিখ, পুরোনো কথা এইসব | একদিন তার ই এক বোনকে তার গার্লফ্রেইন্ড ভেবে কথা বলতে শুরু করলো | বাড়িতে তো এই নিয়ে সবাই খুব হাসাহাসি করলো শুধু সুমন দাদুর বৃদ্ধাবস্থার কথা ভেবে চিন্তান্বিত হয়ে পড়েছিল |
তার এই বাইরে পড়তে আসার ব্যাপারটা দাদু কি করে যে মনে রেখেছিলো সুমন বুঝতে পারে নি | আসার সময় দাদুকে যখন প্রণাম করতে যাবে , অশক্ত হাতে শুধু তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলো ,” পড়াশুনার সময় তোমার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবে, পয়সার অপচয় করবে না আর পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করো “| সবসময় এই কথা গুলোই তাকে প্রেরণা দিয়ে চলে | সারাদিন এইসব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সন্ধের দিকে দেখে বাবার ফোন | একথা-ওকথার মাঝে জানালো দাদুর আজ পারলৌকিক শ্রাদ্ধ হলো | সুমনের পড়াশুনার ক্ষতি হবে ভেবেই আর ঘটনাটা জানায়নি মানে দাদুর মৃত্যুর কথা |

সুমন ফোন রেখে হতভম্বের মতো বসে পড়লো | সকালের সেই স্বপ্ন আর সন্ধ্যে বাবার ফোন দুটো মিলিয়ে তাকে নিশ্চুপ করে দিলো | দাদুকে সে আর কোনোদিন দেখতে পাবে না , তাকে শেষ বিদায়টুকুও সে জানাতে পারবে না এটা যেন সে মানতেই পারছে না | তার শেষ কথাগুলো শুধু তার কানে ভাসতে লাগলো | বিদেশে এসে এরকম শাস্তি যে পেতে হবে সে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি | কিন্তু কি করবে সে এখন ? কাউকে যে মনের কথাগুলো বলবে সে উপায় ও তো নেই | সারাটা রাত বিনিদ্র হয়ে কাটানোর পর সকালে নিজের পড়াশুনায় মন দিলো | দাদুর একটা প্রায়ই ই বলা কথা তার টনিকের কাজ করছে ,” সহজে হাল ছেড়ো না “|এই তিন বছর সে এই মন্ত্রেই চলবে |

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →