story

ধর্ম

স্মিতা ক্লাসে গিয়েই চোখ বুলিয়ে নেয় একবার সব স্টুডেন্টদের যাতে সহজেই বুঝতে পারে কে এসেছে আর কে আসেনি| সে সহজেই বাচ্চাগুলোর মুখ মনে রাখতে পারে| এই গন্ডগ্রামের স্কুলে তেমন তো কেউ আর ফ্যাশনেবল নয় যে প্রতিদিন আলাদা আলাদা দেখতে লাগবে| বরং সবাই একই স্কুল ইউনিফর্ম পরে আসে, তাতে আরো চেনার সুবিধা হয়| আর স্মিতার বাতিক আছে| ওর প্রতিটা স্টুডেন্টদের নিয়ে কৌতুহলটা গলা অবধি| তারা কি খায়, কতক্ষন পড়ে, কতক্ষন খেলাধুলা করে সব,সবকিছু খুঁটিয়ে জেনে নেয় তাদের কাছে আর সেই মতো উপদেশ দেয়| আর এর জন্য সে এই এক বছরের মধ্যেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে| সবাই তাকে খুব আপন ভাবে| স্মিতার এই গ্রামের সহজ-সুন্দর মনের শিক্ষার্থীদের খনি থেকে পাওয়া দামি হীরের মতো লাগে| শুধু ঘষাটা বাকি|
*****
বেশ কদিন ধরে গরম পড়েছে বেশ| ভাদ্র মাসের পচা গরম চলিত কথায়| ক্লাস নিতে বেশ কষ্ট হয় কলকাতার শহুরে আরামদায়ক আদরে বড়ো হয়ে ওঠা স্মিতার| মাকে ফোনে অবশ্য সব কথা খুলে বলে না| শুনলেই শুধু একটা বাক্যই বারে বারে শোনাবে,”ট্রান্সফার নিয়ে যত তাড়াতাড়ি এদিকে চলে আয়, আর নাহলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিয়ে কর”| স্মিতা জানে সে এগুলোর কিছুই আপাতত করবে না| নতুন নতুন ঘটনার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার মজাটা কিভাবে উপভোগ করা যায় সেটা সে বাবার কাছে শিখেছে| তাই এই গ্রাম্য পরিবেশ সে উপভোগ করার চেষ্টা করে| আজকে ক্লাসে গিয়ে দেখলো তিনজন অনুপস্থিত| বন্ধুদের কাছে জানলো একজন গেছে মামারবাড়ি,একজনের বাড়িতে কি একটা পুজো আছে আর একজনের শরীর খারাপ| এই আমিনা বলে মেয়েটা কিছুদিন ধরেই মাথাব্যথায় ভুগছে, স্মিতা লক্ষ্য করেছে| মেয়েটা এমনিতে বেশ রোগা, কিন্তু একদিনে আরো ওজন কমে গেছে যেন| চিন্তা হয় তার| পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ আছে, তার হোমওয়ার্ক গুলো ভালোই করে কিন্তু এই কিশোরী বয়সে অসুস্থ হওয়াটা ভালো ব্যাপার না|কাল স্কুল এলে ভালো করে জানতে হবে |
****
স্মিতার ইংলিশের ক্লাসে সবাই মনোযোগীই থাকে| বিষয়টা এদের কাছে যেন একটু ভীতিপ্রদ| আজকে ঘরে ঢুকে দেখলো আমিনা এসেছে , দুদিকে তেলতেলে বিনুনি ঝুলিয়ে| মন দিয়ে আজকের পোয়েট্রিটা পড়ছে এখন| ” আমিনা কি হয়েছিল? দুদিন আসোনি কেন?” আমিনা উঠে দাঁড়িয়েছে| মাথা নিচু করে আছে| কোনো সাড়াশব্দ নেই|” কি হলো ?” স্মিতা আবার জিজ্ঞাসা করলো| এবার সে নাকটানার শব্দ শুনতে পেলো| ভালো করে দেখলো দুচোখ দিয়ে জল ঝরে পড়ছে আমিনার| গলার স্বরটা নরম করে এবার স্মিতা অভয় দিলো,” ঠিক আছে, তুমি আমাকে সব কিছু বলতে পারো| ক্লাসে না বলতে পারলে পরে জানিয়ো আমাকে|” আমিনার কান্না আরো বেড়ে গেলো| স্মিতা এবার চেয়ার থেকে উঠে ওর দিকে এগিয়ে গেলো|” ম্যাডাম, আজকে অংকের ক্লাসে ও অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো”, নন্দা জানালো| “তাই নাকি?”, স্মিতা খুবই চিন্তিত হলো| কাছে গিয়ে ফুঁপিয়ে চলা আমিনার মুখটা তুলে চোখের জল মুছিয়ে দিলো সে|” কিছু ভয় নেই , আমি তো আছি | আমাকে বোলো|” এই কথাগুলো আর নির্ভরযোগ্য স্পর্শ ম্যাজিক এর কাজ করলো| চোখ মুছে আমিনা জানালো গত তিন সপ্তাহ ধরে তাদের রমজান মাস চলছে, সেই সকালে একটু খাওয়া কারণ একসাথে বেশি খেতে পারে না আবার সন্ধ্যের পরে খাওয়া| সাথে সারাদিন জল না খাওয়া| সে আর পারছে না| মাথা ঘুরছে মাঝে মাঝে, খুবই দুর্বল লাগছে| এবার স্মিতার চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো এটা জেনে যে এই চোদ্দ বছরের ফুলের কুঁড়ির মতো মেয়েটা দাঁত চেপে ‘ধর্ম’ নামের অসহায়তাকে কেমন করে সহ্য করে যাচ্ছে| কাছের মানুষের মতো আমিনার মাথাটায় হাত বুলিয়ে কাছে টেনে নিলো সে,” ধর্মের আগে তুমি, শুধু তুমি, তোমার শরীর, মন সবকিছু| কাল থেকেই আর উপবাস করবে না| আমি বলছি| দরকারে তোমার বাড়িতে গিয়ে বলে আসবো| ঠিক আছে?” আমিনা মৌন হয়ে রইলো তখন কিন্তু পরদিন থেকে স্মিতা দিদিমনির কথাকেই ‘ধর্ম’ বানিয়ে নিলো|

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →