story

হ্যাপি প্রজাতন্ত্র

রবিবারের সকালে সপ্তাহের বাজারটা একটু বেশি ই করে রাখে তন্ময় , আজকে আরো একটু বেশি করে রাখার ইচ্ছা আছে | মাছের নানা ভ্যারিটি, মাংস , ডিম সব ফ্রিজে রেখে দিলে সামনের সপ্তাহে বাজার আসার সময়টা বাঁচানো যাবে | সামনের সপ্তাহে যে লং উইকেন্ড মানে অনেক দিন পর একটা তিনদিনের লম্বা ছুটি পাওয়া গেছে | কি করবে , কোথায় যাবে তেমন কোনো প্ল্যান অবশ্য করেনি | আপাতত তাই খাবারের উপরেই মনোযোগ দিয়েছে | এটা সেটা নতুন নতুন রান্না এখন তুহি বেশ মজা করে খায় |

*******************************************
তুহি তন্ময়ের পাঁচ বছরের মেয়ে | পাঁচ বছর সংখ্যায় কম লাগলেও , ওকে যদি দেখো , ওর কথা যদি শোনো তবে বোঝা যাবে তুহি পঞ্চাশ বছরের ঠাম্মিকেও হার মানিয়ে দেয় | এখন থেকেই যেমনি গুছিয়ে কথা তেমনি গুছিয়ে কাজ | মোবাইল,টিভি, ইন্টারনেটের তো একটা ছোট খাটো ” স্নোউডেন “| ঠাম্মি এখন তুহির কাছ থেকে হোয়াটস্যাপ করা শিখছে |
” কি রে উঠলি ?” , বাজার করে নিয়ে এসে তন্ময় ডাক দেয় তুহিকে | ঝেড়েমেড়ে উঠে পড়লো তুহি | ও জানে আজকে সানডে , মানে বাবা সারাদিন বাড়িতে | অনেক অনেক মজা হবে | আজকে বাবা আর ও মিলে একটা প্লে হাউস বানাবে ,পিচ বোর্ড বাক্স দিয়ে | উঠেই বকবক করা শুরু ও হয়ে গেলো , মানে প্রশ্নের পর প্রশ্ন | তন্ময় অবশ্য চেষ্টা করে সব কিছুরই উত্তর দিতে , ওর কৌতুহলটাকে মেটাতে |
” তুমি বাজার গিয়েছিলে ?”
” হাঁ , কখন গিয়েছিলাম , তুই তো তখন ঘুমাচ্ছিলি |”
” কি কি আনলে , পমফ্রেট মাছ এনেছো ?”
” হুন , এনেছি | আর আর বাকিগুলো বলবো না | যখন খাবে তখন দেখতে পাবে | সারপ্রাইজ , ঠিক আছে ?”
” একটা বোলো , প্লিজ বাবা আর একটা ফিশের নাম বোলো না “, ছোট তুহির নরম আবদার |
” ঠিক আছে , ওই নামটা চ দিয়ে শুরু হয়েছে , গেজ কর |”
” বুঝে গেছি আমি “, তুহি হাত তালি দিয়ে বললো |
” কি ? বল নামটা ”
” শেষটা র দিয়ে , সেটা ?” তন্ময় ঘাড় নাড়ছে আবার হাঁসছে ও , তুহি ও সোজা করে উত্তর দিলো না শুনে |
” চল , ব্রাশ করে নিয়ে আমরা একটু পড়বো , তারপর খেলা খেলা হবে |”
আজকে তুহির খুব এনার্জি , অন্যদিন স্কুলে যাবার আগে ঘুম থেকে উঠিয়ে ব্রাশ করতে সময় লাগে কিন্তু আজ নিজে নিজেই সব করে নিলো |

*******************************************************
তন্ময় , তনিমা নিজেদের নামের সাথে মিলিয়েই মেয়ের নাম রেখেছে , তুহি | ছোট্ট আর সুন্দর নাম,ডাকতেও সুবিধা,লিখতেও | মেয়ে হবার পর থেকে নিজেদের সমস্ত মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু তুহি ই | কি পরবে , কি খাবে, কখন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে সব নিয়ম করে করে | নতুন স্কুলে ভর্তি হবার আগে ফর্ম তোলা, ইন্টারভিউ র প্রিপারেশন সব কিছুই নিখুঁতভাবে করেছে , মেয়ে পেয়েও গেছে একটা ভালো স্কুলে এডমিশন | মেয়ের হাতের কাছে একটা ছেড়ে দশটা খেলনা, তাও আবার দশ রকমের তো বটেই | তুহির ও এখন থেকেই বেশ লেখাপড়ায় আগ্রহ | নিজে যা শিখে আসে স্কুল থেকে , সাথে থাকা পুতুল গুলোকে ধরে ধরে আবার সে গুলো শেখাবে সে | ওদের ম্যাডাম হয় সে তখন | তন্ময় বেশ কবার মোবাইলে ভিডিও করে রেখেছে সেটা |
” বাবা , আজকে আমাদের আর একটা বানাতে হবে |” প্লে-হাউস বানানোর সময় তুহি বললো তন্ময়কে |
” কি সেটা ?”
” আমাদের ম্যাডাম একটা ফ্ল্যাগ বানিয়ে নিয়ে যেতে বলেছে বাড়িথেকে | আমাদের রিপাব্লিক ডে হবে ”
” কি ফ্ল্যাগ, তুই জানিস ?”
” জানিতো “, দৌড়ে গিয়ে নিজের ড্রইং বুকটা নিয়ে এলো তুহি |পাতা উল্টে দেখিয়েও দিলো ,” এই দেখো , এইটা আমাদের ফ্ল্যাগ | উপরে অরেঞ্জ , মাঝে হোয়াইট আর নিচে থাকবে গ্রিন | আর এখানে, এই দেখো এখানে একটা হুইল থাকবে | ঠিক আছে ?”
পাকা মেয়ের মতো বললো তুহি |
” কি দিয়ে বানাবো আমরা ? বোর্ড দিয়ে ?”
” না , আমরা খুব সুন্দর করে বানাবো | কাপড় দিয়ে | ”
তন্ময় বললো বটে কিন্তু ও জানে কাপড় দিয়ে সেলাই করে বানাতে অনেক ক্ষণ সময় নেবে , বরং রাস্তায় কিনতে পাওয়া যায় , একটা কিনে আনবে |

*****************************************************
আজকে সকালে উঠতে একটু দেরি হয়ে গেছে | তুহিকে স্কুলে ছেড়ে , একটা ব্যাংকের কাজ সেরে অফিস যাবে আজ তন্ময় | ব্যাংকটা অবশ্য স্কুল যাবার আগেই পরে কিন্তু একটু ঘুরে রাস্তা , এই কাজটা আগে সেরে নিলেও মন্দ হয় না | হিসাব কষে দেখলো সময়ে হয়ে ও যাবে |
” আমরা কোথায় যাচ্ছি ?” অন্য রাস্তা দিয়ে যেতে তুহির প্রশ্ন |
” একটা ব্যাঙ্ক আছে যেখানে অনেক টাকা জমা থাকে , সেখানে | ”
” খুব বড়ো বাড়ি তো তাহলে বাবা , অনেক টাকা থাকে বলছো ?”
” গেলেই দেখতে পাবে “|

বড়োসড়ো ট্রাফিকটায় দাঁড়াতে হলো কিছুক্ষন | এই রাস্তার এই জ্বালা , এই ট্রাফিকে দাঁড়ানো মানেই খানিক ভিখারির উৎপাত শুরু হবে | তন্ময় একবার চোখ বুলিয়ে নিলো , দেখে সব উইন্ডো গুলো ঠিক বন্ধ আছে কি না | এসে তো সেই জানলা গুলো চাপড়াবে | উফফফ, ভাবতে না ভাবতেই হাজির , সেই নোংরা বাচ্চা গুলো | এদিকে এলে প্রায়ই চোখে পরে কটা বাচ্ছাকে , হয় তারা ভিক্ষা চাইছে , নয়তো ফুল বিক্রি করছে আর নয়তো ম্যাগাজিন | আজকে আবার হাতে কি ? একটা মেয়ে গাড়ির কাছে এসে গেছে | তুহি যেদিক তাই বসেছে সেখানে জানালায় এসে ইশারায় জানতে চাইছে ফ্ল্যাগ নেবে কিনা | তন্ময়ের মনে পড়লো , তুহির স্কুলের কথা | সুযোগ এসে গেছে যখন কিনেই নেই | জানলার কাঁচ নামিয়ে,দুটো ফ্ল্যাগ কিনে ঠিকমতো দাম মিটিয়ে দিলো |স্কুল ড্রেস পড়া তুহি এতক্ষন অবাক চোখে সবটা দেখছিলো কিছু না বলে | মেয়েটাকেই বেশি করে দেখছিলো সে , মনে তো হলো তুহির ই বয়সী | মেয়েটা চলে যাবার পর তুহির প্রশ্ন ,” বাবা ও স্কুল যাবে না ? ওর স্কুল ড্রেস নেই কেন ?”
গাড়ির সিটে তন্ময় একটু নড়ে -চড়ে সোজা হয়ে বসলো | এই প্রশ্নটার কি উত্তর দেবে সে ? কোনো উত্তর ই তো খুঁজে পাচ্ছে না |
” আর একটু পরেই তোমার স্কুল এসে যাবে |”
” বাবা , বলোনা , ও কখন যাবে স্কুল ?”
তন্ময় এখনো চুপ | সারাদিন চুপ | অফিসের কাজের ফাঁকেও তুহির নিরীহ প্রশ্নটা মাথায় ঘা দিচ্ছে, দিয়েই যাচ্ছে | বাড়ি ফেরার পথে একটা বুকস্টোরে ঢুকে বেশ কিছু বই, পেন্সিল , খাতা কিনে নিয়ে এলো | ফিরতেই তুহির প্রশ্নের সামনে পড়তে হলো |
” কি এগুলো ? প্যাকেটে ?”
” খুলেই দেখো |”
” বাবা, এই বুকগুলো সব আমার পড়া হয়ে গেছে তো | আবার এনেছো কেন ?”
” পেন্সিল গুলো শুধু তোমার , বইগুলো তোমার নয় |”
” কার ওগুলো ?”
” আজকে রাস্তায় যে বন্ধুটাকে দেখলে , তার | সে মনে হয় পড়া শেখে না , তুমি তার ম্যাডাম হতে পারবে ?”
তুহি কতটা বুঝলো জানা নেই কিন্তু ছোট করে ঘাড় নেড়ে বললো , ” হাঁ পারবো তো , ওকে আমাদের বাড়ি নিয়ে এস |”
তন্ময় বললো , ” আনবো তো |”
সামনের লং উইকেন্ডের জন্য ওটাই ভেবে নিয়েছে সে | ওখানে গিয়ে খোঁজ নেবে মেয়েটার ব্যাপারে , দরকারে তার পড়াশুনার সব দায়িত্ব ওই নেবে ঠিক করেছে সে |বন্ধুদের ও বলবে আইডিয়াটা | তার মতো সবাই যদি একজন করে “রাস্তার বাচ্চার ” দায়ভার নেয় তাহলে আর কোনো বাচ্ছাকে হয়তো ভবিষ্যতে রাস্তায় রাস্তায় দেশের পতাকা বিক্রি করতে হবে না | ছোট্ট তুহির ছোট্ট প্রশ্নটা তার চোখ খুলে দিয়েছে | দিনটা সত্যি মনে হচ্ছে “হ্যাপি রিপাব্লিক ডে ” ই হতে যাচ্ছে |

Tagged , ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →