a thought

জীবনের ফাঁদ

নিজেকে সুখী করাই হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে বড়ো ফাঁদ | স্কুলে পড়ার সময় শোনা যায় ,” এখন মন দিয়ে পড়ে নে, ভালো রেজাল্ট করার পর ভালো কলেজে গেলেই তোমার জীবন তৈরী হয়ে যাবে আর সুখী হবে |” হাঁপিয়ে , কাঁপিয়ে পড়ে যখন কলেজে যাওয়া হলো তো আবার কানে আস্তে থাকলো ,” কলেজের পড়াশুনা ভালো করে করার ফল পাওয়া যাবে যখন একটা দারুন চাকরি পাওয়া যাবে আর তাতেই জীবনে সুখী হওয়া যাবে |” কলেজের পর সত্যি ই একটা ভালো চাকরি পাওয়া ও গেলো | নতুন চাকরিতে ঢোকার পর সকলের কাছ থেকে একটাই কথা ,” ভালো করে পরিশ্রম করে একটা ভালো জায়গা বানিয়ে নিলে আর পিছন দিকে তাকাতে হবে না , তুমি জীবনে সুখী হয়ে যাবে |”

ছোট থেকে এতক্ষন পর্যন্ত তো ঠিক চলছিল কিন্তু এখন ঠিক এই জায়গাটায় এসে তোমার মনে সন্দেহ জাগবে সত্যি ই কি জীবনে সুখী হওয়া সম্ভব ? তখনি তোমার অন্য কিছু করতে ইচ্ছা করবে, জীবনের এই সুখী হওয়ার ফাঁদ থেকে বেরোতে ইচ্ছা করবে | আবার কারো কারো এই ইচ্ছাটা অনেক দেরিতে হয় যখন হয়তো অনেক সময় বয়ে যায় জীবনের | সেই শেষ সময়ে সে ভাবতে বসে , আচ্ছা, তাজমহল টা তো দেখলাম না , কেমন করে পুরানো দিনের লোকেরা মার্বেল নিয়ে এসেছিলো তাও জানলাম না , জীবনটাই বৃথা |কোনো কিছু পাওয়া বা অর্জন করার মধ্যে হয়তো সাময়িক সুখ লুকিয়ে থাকে কিন্তু সুখী হওয়াটা উপলব্ধির জায়গা থেকে পাওয়া যায় |সুখী হওয়ার জন্য আমাদের আলাদা করে কিছু করার দরকার নেই , প্রতি মুহূর্তই আমাদের সেটা দিতে পারে | বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের একটা বিখ্যাত উক্তি আছে ,” বেশিরভাগ মানুষই পঁচিশ বছর বয়সে মারা যায় কিন্তু তাদের কবর দেয়া হয় না যতদিন না তারা পঁচাত্তরে পা দেয় “|

ভালো চাকরি, দারুন পরিবার, প্রচুর টাকা, সুঠাম শরীর, দামি গাড়ি, নতুন বাড়ি , উপভোগ্য ছুটি, ভালো বন্ধু সব সব পাওয়ার থেকেও ভালো পাওয়া হলো একটা সুন্দর অন্তর্দৃষ্টি | সুখী হওয়ার লোভের পিছনে ছুটতে ছুটতে আমরা হোঁচট খাই,দাঁড়াই ,চেষ্টা করি , অভিযোগ করি , অন্যের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করি আর এসব করতে করতে নিজেদেরকেই ভুলে যাই | আমরা নিজের খাঁচা নিজেরাই তৈরী করে অহংকার আর কামনা দিয়ে | ভুলে যাই দেখতে রামধনু, বৃষ্টি পড়া দেখতে , এমনকি ঘাসের রং যে কি সেটাও ভুলে যাই |

তবে কিছু ব্যাপার যদি ছোটবেলা থেকেই মেনে চলা যায় তবে সত্যি ই কি এই ফাঁদ থেকে বেরুনোর রাস্তা হয়তো হয়তো খুঁজে পাওয়া যেতে পারে | দেখা যাক কিরকম সেগুলো

১) নিজের সীমা জানা-নিজের গন্ডি নিজে টেনে তার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা একটা অন্যতম খারাপ দিক |” আমি এইরকম, আমি ঠিক ওটা করতে পারি না “, এইসব চিন্তা-ভাবনা থেকে বেরিয়ে খোলা চোখে সবকিছু যাচাই করলে অনেক উপকার পাওয়া যায় | নেতিবাচক চিন্তা নিজেকে কমজোরি করে দেয় | যেমন, কেউ হয়তো অংকে কমজোরি , তার এই দুর্বলতার দিক দেখে যদি কোনো শিক্ষক তাকে উৎসাহ জুগিয়ে যেতে পারে দেখা যাবে কোনো একদিন সেই হয়তো অংকের বিষয় নিয়ে রিসার্চ করছে |

২)অতীত তোমাকে তৈরী করে– বেশিরভাগ সময়েই বেশিরভাগ মানুষ দুটো জিনিস নিয়ে খুব ভাবে আর তাহলো অতীত আর ভবিষ্যৎ | কিন্তু সমস্যাটা সেখানেই , কেননা কোনোটারই অস্তিত্ব নেই | যা আছে তাহলে শুধু ” বর্তমান” | মানুষ ভাবে যে অতীত ই তার ভবিষৎ তৈরী করে , সেটা কিছুটা হলেও ঠিক | অতীত যদি খুবই ভয়ঙ্কর হয় তবে তার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা মুশকিল | বর্তমানেও তার আবর্তে পরে খালি ই মানুষকে ভাবিয়ে তোলে |ফলে বর্তমান মন ই তোমাকে ভবিষতের রাস্তায় নিয়ে যায় আর সেটা তখন অনেক সময় খারাপ অতীতের ই ছায়া হয়ে যায় | এই অতীতের ছায়া আর মায়া থেকে মুক্তির একটাই উপায় তাহলো অতীতকে পিছনে ফেলে আসা | আমরা সবাই মানুষ , তাই ভুল করতে অভস্ত্য | তবে সেই ভুলের জন্য নিজেকে শাস্তি না দেবার উপায় হলো বর্তমান নিয়ে থেকে | এই সেকেন্ড, এই মিনিট, এই ঘন্টা , এই মাস, এই বছর এই সবগুলোর ই প্রাধান্য দেয়া বেশি করে | অতীতকে কখনই ভবিষতের নির্দেশক করা যায় না আর সেটা একমাত্র নিজেকেই বুঝে করতে হবে | এই কাজে কারোর সাহায্য ই যথেষ্ট নয় যতক্ষণ না তুমি উঠে দাঁড়াচ্ছ |

৩)নিজেকে বস্তুবাদী বানিয়ে ফেলা– অনেকেই নানা জিনিসের মালিক মানে ভোগ্য বস্তু আর কি | অনেকেরই কাছে গাড়ি,বাড়ি, পোশাক এইসব নিজেদের পদমর্যাদা জাহির করার পথ | কিন্তু তুমি যদি নিজের সঠিক অবস্থান জানো, আত্মবিশ্বাসী হও তবে এই ধরণের সাময়িক ভোগ্যপণ্য তোমাকে বিচলিত করতে পারবে না | মনের কোনে যদি জেনে থাকো ,” তুমিও এই পৃথিবীতে কিছুই নিয়ে আসোনি আর কিছুই নিয়ে যাবে না ,” তাহলে তোমাকে কে আটকাবে ?

৪)অতিরিক্ত খরচ– জাগতিক বস্তু অর্জন করা আমাদের কাছে অনেক সময় লোভের ব্যাপার হয়ে যায় | আর এই লোভ ই তখন আমাদের প্ররোচিত করে করে কোনো বস্তুর পিছনে অতিরিক্ত খরচ করতে | জীবনে উপার্জন করে সঞ্চয় করা উচিত এই জন্য যে টাকা-পয়সা মানুষকে অনেক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত রাখে |আমাদের স্বাধীনতা দেয় মুক্ত ভাবনা ভাবতে | কিন্তু তার বদলে আমরা নিজেদের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কোনো পছন্দের জিনিসের পিছনে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে ফেলি তখন হয়তো সাময়িক আনন্দ পাওয়া যায় , তবে পরে নিজেরা দুশ্চিন্তা গ্রস্ত হয়ে পড়ি | দুশ্চিন্তায় থাকি যে কেন এতো খরচ করলাম, ঋণ হয়ে থাকলে শোধ করবো কি করে এইসব | তাই এই স্বভাব থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে |

৫)হাতে অনেক সময় – এই কথাটা অনেকেরই মুখে শোনা যায় কিন্তু সত্যি কথাটা হলো কেউ ই জানে তার কাছে কতটা সময় আছে | জন্ম যখন হয়েছে তখন মৃত্যু অবধারিত | ধরে নেয়া যাক, মানুষের গড় আয়ু আশি বছর কিন্তু কে বলতে পারে এখুনি রাস্তা পার হতে গিয়েই তোমার মৃত্যু হবে না ? পৃথিবীতে আপন গতিতে চলবে কিন্তু তোমার কি হবে তখন তুমি জিবনে যা যা করবে ভেবেছিলে সেগুলো আর করা হয়ে উঠবে না ? তখন কি তুমি নিজে বলতে পারবে ,” যদি আমি “| না, তখন সত্যিই ই অনেক দেরি হয়ে যাবে | তাই বসে না থেকে , দীর্ঘ্যসূত্রিতা না করে যদি কিছু করতে চাও তো এখন ই পরিকল্পনা শুরু করো , যা করবার এই মুহূর্তেই করো | আগামীকাল গুলো আসতেই থাকুক |

৬)আরামের জায়গা – মনের কোনে যদি কোথাও কোনো আরামের জায়গা তোমার থেকে থাকে তাহলে সেই জায়গাটা হলো তোমার ই কবরখানা | দিনের পর দিন যদি এই আরামের জায়গাটাকে নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে তাহলে সে হয়ে উঠবে অথর্ব , আর সেটা শারীরিক, মানসিক উদ্যম কেও মেরে ফেলবে | আসলে মানুষ নামক প্রাণী আরামেই থাকতে পছন্দদ করে আর তার জন্য ই চলে সারাদিনের দৌড়ঝাম্প | আমরা, জ্ঞানী মানুষেরা যতক্ষণ না প্রতিকূল অবস্থায় পরবো ততক্ষন কোনো চেষ্টা সহজে করি না | কিন্তু প্রকৃতি আমাদের এর জন্য তৈরী করে নি , সে চায় মানুষ এগিয়ে চলুক | মানুষের স্থবিরতা সে চায় না | তাই যত রকম ভাবে যেমন শারীরিক, মানসিক পরিপূর্ণতা পেতে হলে আমাদের মনের কোন ছেড়ে, ঘরের কোন ছেড়ে অবশ্যই বেড়িয়ে পরতে হবে | ব্যায়াম করতে হবে, ধ্যান করতে হবে, নিজেকে খোলামেলা ভাবে লোকের সামনে তুলে ধরতে হবে আর এর মাধ্যমেই আরও বেশি নিজেকে শক্তিশালী করে তোলা যাবে |

আমিও এসবের চেষ্টাতেই আছি , এখন যারা লেখাটা পড়লে তারাও ভেবে দেখো নিজেদের কে কিভাবে “জীবনের ফাঁদ” থেকে মুক্ত রাখতে পারবে সেটার জন্য কিছু সাহায্য করতে পারলাম কি না |

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →