story

কন্যা

জানলার ধরে টেবিলে বসে লেখাটা কমপ্লিট করতে করতে কিছু পুরোনো কথা মনে পরে গেলো দীপিকার | খাতা-পেনটা পাশে সরিয়ে রেখে উদাস দৃষ্টিতে জানলার দিকে তাকিয়ে ছিল |
” মা , কি ভাবছো? আজকে ওষুধ টা খেয়েছো ?” , অনন্যার প্রশ্নে চমকিত হলো |
” হ্যাঁ রে খেয়ে নিয়েছি , এই উত্তরটা লিখে নিয়েই আসছি দাঁড়া |” আবার খাতা টেনে নিয়ে লিখতে শুরু করলো সে | মেয়েও আর ডিস্টার্ব না করে ড্রইং রুমে চলে গেলো |
*******************
জীবনটা চলতে চলতে থেমেই গিয়েছিলো দীপিকার | তবে এই থামা সে কাউকে বোঝাতে পারতো না , এমনকি নিজেকেও না | বোঝাবে কি করে আর লোকেই বা বুঝতে যাবে কেন ? শশুর-শাশুড়ি, পুত্র-কন্যা, স্বামী , চাকর-কাজের মেয়ে নিয়ে যাকে বলে ভর-ভরন্ত সংসার তার | কিন্তু সে ভালো থাকে না , শরীর তো ঠিকই আছে , কিন্তু যেখানে অন্ধকার হয়ে আছে তাহলে তার মন | এই মন খারাপের কি সত্যি ই কোনো ওষুধ আছে ? নির্মল কে একটু-আধটু বললে কিছু না বলে সোজা নিয়ে গেলো মনোবিদের কাছে | তিনি ও খানিক বুঝেশুনে দীপিকাকে ” হতাশাগ্রস্ত” রুগীর তকমা দিয়ে খানিক ওষুধ দিয়েছেন | মেয়ে এতক্ষন সেটারই তদারকি করে গেলো , মেয়েরা যে জন্মগত ভাবেই কেয়ারিং|
*********************
সেই পঁচিশ বছর আগে বিয়ে হয়েছে দীপিকার | তার কলেজে সে ফার্স্ট-ক্লাস পেয়েছিলো সে ফিজিক্স বিষয়ে | আরো আরো পড়ার ইচ্ছা ছিল , মাস্টার ডিগ্রি, গবেষণা করা এসব ও | উপরি পাওনা ছিল কলেজ থেকে ই একটা ভালো কোম্পানি তে চাকরির অফার | বাড়িতে জানাতেই সবাই আতঙ্কে শিউরে উঠলো যেন নাজানি কি একটা অপরাধ করে ফেলেছে দীপিকা | শাস্তি হিসাবে শুরু হলো পাত্র দেখা , বিয়ের জন্য | উচ্চপদস্থ ব্যাঙ্ক-অফিসারের সাথে বিয়েও হয়ে গেলো | বাপের বাড়ি যেমন ছিল রক্ষনশীল, শশুরবাড়ি ও পেলো তেমন | সব কিছুর সাথে ভালো করে খাপ খাওয়াতে না খাওয়াতেই তেইশ বছরেই মা হবার সৌভাগ্য হয়ে গেলো দীপিকার | বিয়ের এক বছরের মধ্যেই একটা অত্যন্ত দায়িত্বের কাজ তার কাঁধে | দুই বছর যেতেই আবার অর্ঘ্য হলো | বর তো মাঝে মাঝে অফিসের কাজে এদিক ওদিক যায় কিন্তু দীপিকার তো কোনো ফাঁকি নেই সংসারের কাজে | ছেলে-মেয়েদের স্কুল, হোমওয়ার্কের সাথে পাল্লা দিয়ে চলে অসুস্থ শশুর শাশুড়ির সেবা | সময়মতো তারাও গত হলেন, ছেলে-মেয়ে নিজেদের পড়াশুনা নিয়ে নিজেরাই দায়িত্বশীল | এই অখণ্ড অবসরে জাঁকিয়ে বসলো সেই ” হতাশাটা “, যাকে মাঝে মাঝেই দীপিকা বুঝিয়ে রেখেছিলো মনের কোণে |
************************
ডাক্তার তো বলেই চলে অনেক গালভরা কথা, এইসব ডিপ্রেসিভ রুগীদের কি করতে হবে, কেন হয় , কত রকমের রুগী আসে তার কাছে এইসব | দীপিকাও শুনে আসে, কিন্তু কোনো বড় রকমের উপকার হয়না তাতে | বন্ধু রুবি একদিন পরামর্শটা দিলো ,” তুই বাড়িতেই বাচ্চাদের টুইসন নে না | বসে না থেকে ব্যস্ততার মধ্যে থাকবি , মনটাও হালকা থাকবে | তুই তো পড়তে-পড়াতে ভালো বাসতিস |” উপদেশটা মনে ধরলো দীপিকার, নানা জনকে বলে জোগাড় ও করে ফেললো পাঁচ-সাত জন বাচ্চা | ছেলে-মেয়েদের পড়ানোর দৌলতে সিলেবাস টা জানা ছিল, তাই কোনো অসুবিধা ও হলো না পড়ানোতে | স্টুডেন্ট বাড়তে বাড়তে পাঁচ মাসের মধ্যেই পনেরো জন হয়ে গেলো |

**************************
দীপিকার একটা বদভ্যাস আছে যে সবকিছুই খুব গভীর ভাবে করতে চায় | বোঝা গেলো না তো ?
সে উপর উপর না থেকে যে কোনো সমস্যা নিয়েই ভীষণ ডুবে যায় | এই যেমন বাচ্ছাগুলোকে পড়াতে গিয়ে প্রায়ই দেখছে ওদের ও যেন তারই মতো হতাশায় ভুগতে | স্কুল যাওয়া, পড়াশুনা করা , হোম ওয়ার্ক এগুলো তো আনন্দের সাথে করলেই ভালো | কিন্তু বাচ্চা গুলো যেন হাসতেই ভুলে গেছে | বই খুলতে হয় ভয় না হয় বিরক্তি | কেউ যদি কারোর থেকে এক নম্বর ও কম পায় তো দীপিকা মা-বাবাদের কাছ থেকে এতো ফোন পায় যেন পরীক্ষাটা ওই দিয়ে এসেছে | সে নিজে কোনোদিন ছেলে মেয়েদের এমনি করে প্রতিযোগী পরায়ণ করে তোলেনি | শিখিয়েছে শিক্ষাকে ভালোবেসে গ্রহণ করতে হয় নাহলে এটা বোঝা হয়ে দাঁড়ায় |ভেবে ভেবে সে বুঝতে পারলো বাচ্ছাদের নয় , বাবা-মায়েদের ই আসল শিক্ষা দরকার যাতে সন্তানদের উপর চাপ দেওয়াটা তারা কর্তব্য বানিয়ে না ফেলে | কিন্তু একজন-দুজনকে বোঝানোর থেকে যদি পেশাগত ভাবে এটা করা যেত তাহলে হয়তো তার ওজন আরো বেশি হতো |
*****************
ছেলে মেয়েদের বলাতে ওরাও খুব উৎসাহের সাথে ইন্টারনেট সার্চ করে বার করে ফেললো অনেক সার্টিফিকেশন কোর্সের নাম | হাসব্যান্ড ও সাথে দিলো, ” বললো করবেই যখন তখন তোমার অনেক দিনের মনের ইচ্ছাটা পূরণ করে নাও , মাস্টার ডিগ্রিটা করেই নাও |” দীপিকা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো নির্মলের দিকে যেন এই প্রথম দেখছে | ” আরে, ওতো অবাক হচ্ছ কেন , আমার হাত-পা বাঁধা ছিল, জানোই তো বাবা-মা কেমন ছিলেন | ” দীপিকা আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করলো ,” টাকা- পয়সার ব্যাপারে অসুবিধা হবে না তো “, ছেলে -মেয়ে পাশেই ছিল, চিৎকার করে জবাব দিলো ,” মা চিন্তা করো না , দরকারে আমরা হাত খরচ নেয়া কম করে দেব তবু তোমাকে পড়া শেষ করতেই হবে | দীপিকার চোখ ছল ছল করে উঠলো |
****************
টেবিলে বসে তার সেই পড়াশুনাই করছিলো | গালভরা নাম আছে অবশ্য ডিগ্রিটার ,”আরলি চাইল্ড হুড এডুকেশন “| প্রথম প্রথম ক্লাসে যেতে তার লজ্জা পেতো | সাতচলিশের দীপিকার ক্লাসমেটরা তো তার ছেলেরই সমবয়সী | কথা বলতে কি আড়ষ্টতায় ভুগতো | তবে আজকাল কার ছেলে-মেয়েরা অনেক সমঝদার , খোলা মনের | তারাই এগিয়ে এসে তাকে নিজেদের বন্ধু করে নিয়েছে | মজা করে তো কখনো কখনো নানান রকমের রান্না খাবার বায়না করে , দীপিকাও ভালোবেসে বানিয়ে নিয়ে যায় | সেই ছোট বেলার স্বপ্নটা আজকে যখন পূরণ হচ্ছে , নিজেকে বেশ সফল লাগে | সেই অনুগত, বাধ্য মনটা কোথাও যেন ডানা মেলে আজ বিদ্রোহী | পড়াশুনা শেষ করে চাকরি নিয়ে তার ইচ্ছা তার ই মতো মেয়েদের কাছে সে একটা উদাহরণ হয়ে উঠতে , তাদের উৎসাহ করতে যে পড়াশুনা করার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই | এক বছর হয়েও গেলো দেখতে দেখতে আর এক বছর হলেই তার মাস্টার্স ডিগ্রি কমপ্লিট | এই এক বছরে দীপিকার অনেক পরিবর্তন হয়েছে | মনের সাথে সাথে শরীরের ও | রুক্ষ চেহারার, মনোরোগীর ওষুধ খাওয়া দীপিকা এখন প্রাণবন্ত অষ্টাদশী যেন | আসলে সে যে এখন তার নিজের মধ্যে থাকা ” মেয়ে”টাকে খুঁজে পেয়েছে , আবিষ্কার করেছে নিজস্ব আমিটাকে |

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →