mythology, story

কন্যা যখন কুমারী

নারীর কৌমার্য্য কি বরণীয় ? সমাজের কথা নিয়ে বলতে গেলে অনেক তর্ক-বিতর্ক শুরু হবে কিন্তু আমি যার কথা বলতে যাচ্ছি সেখানে তিনি সত্যি ই পরম বরণীয়া | গল্পটা অবশ্য পুরান থেকে সংগৃহিত , কন্যা কুমারীর মাহাত্ম্য দক্ষিণ ভারতের শ্রেষ্ঠ পুরান কাহিনী |

স্বর্গ্যরাজ্যে দেবতাদের শিয়রে সমন ঝুলছে , সকলেই ভীত-সন্ত্রস্ত | ভয়ের কারণ অসুরদের রাজা বানাসুর , স্বর্গ্য তার দখলে | বাণাসুরের একটাই প্রতিজ্ঞা , সসাগরা ধরিত্রীর অধিপতি হওয়া | দেবতারা পদে পদে তার কাছে পরাজিত | সমগ্র ভারতভূমি বাণাসুরের দখলে , দেবতাদের ধ্বংস করে ছিল তার লক্ষ্য |

বিপদে পড়লে আমাদের মুখেও যেমন মা ডাক ই প্রথমে আসে, দেবতারাও তার ব্যতিক্রম নয় | দেবতাদের স্তব-স্তুতিতে সন্তুষ্ট হয়ে মহামায়া প্রকটিত হলেন | দেবতারা জানালেন দক্ষিণতম প্রান্তে তাঁকে থাকতে হবে “কন্যাকুমারী ” রূপে | মহাশক্তি মহামায়া তথাস্তু বলে দেবতাদের প্রার্থনা পূরণ করলেন |

তিন সাগরের সঙ্গমস্থলে দাঁড়িয়ে কন্যাকুমারী মাতা শুরু করলেন তপস্যা , মহাদেব শঙ্করের জন্য | শক্তির সেই তপস্যাবলে টনক লড়লো কৈলাশবাসী শিবের , উত্তরের পর্বতশিখর থেকে চললেন দক্ষিণের সমুদ্রপ্রান্তে | মিলনের জন্য শিব-শক্তি , দুজনেই উদগ্রীব |

অন্যদিকে হাহাকার পরে গেলো দেবতাদের মধ্যে | তারা তো জানে , বাণাসুরের নিধন একমাত্র কুমারী মেয়ের হাতেই হবে | শিবের সাথে যদি কন্যাকুমারী মিলন হয় তবে তো …..| উপায় না দেখে তারা নারদের সাথে পরামর্শ করলেন | কূটবুদ্ধি ধারী নারদ চললেন শিবকে বোঝাতে , শিবের সামনে উপস্থিত হয়ে আগ্রহভরে জানালেন মিলনের শুভ -দিনক্ষণ | বললেন , ” প্রভু , দেবী মাতাকে আর কত কষ্ট দেবেন ? তিনি এবার অভিমানিনী হয়ে উঠেছেন | বলেছেন ওই দিন , ওই সময়ের মধ্যে যদি শিবের না দেখা পাই তবে আমি সারাজীবন কুমারী থাকার ব্রত গ্রহণ করবো |”

দেবী কন্যাকুমারী কাছে ও গেলেন নারদ মুনি | মুখে মধু দিয়ে জানালেন , ” মাতা , তোমার তপস্যার কথা আমি শিবকে জানিয়েছি | তিনিও জানিয়েছেন অমুক দিনে তোমার সাথে মিলিত হবেন , আর কিছুদিন ধৈর্য্য ধরুন |”

দেখতে দেখতে শুভদিন ঘনিয়ে এলো , শিব ও পৌঁছালেন কন্যাকুমারীর কাছাকাছি সুচন্দ্রিমে | বিরহ তপস্যার শেষ হয়ে আর বাকি নেই , কাল রাত্রি শেষের ব্রাহ্ম মুহূর্তে মিলনের শুভক্ষণ | কন্যাকুমারীর অপেক্ষার শেষ হতে চললো , শিব ও অপেক্ষারত সুচন্দ্রিম নামের জায়গায় , কন্যাকুমারী থেকে মাত্র কিছু মাইল দূরে |

শেষ রাত্রির তৃতীয়পাদ , আর কিছু পরেই হবে ঊষার প্রথম মুহূর্ত , মিলনের পরম ক্ষণ | নারদ উপায় না দেখে দূর থেকে কুককুট ধ্বনি করে উঠলেন | চমকে উঠলেন শিব , প্রভাত হয়ে গেলো যে | পার হয়ে গেলো মাহেন্দ্রক্ষণ , প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেননি তপস্বিনী কন্যাকুমারীর কাছে | সুচন্দ্রিমে ই স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন শিব | রাত্রি সত্যি করেই সকাল হলো , অপেক্ষারতা কন্যাকুমারীর কাছে এলেন না শিব | কিন্তু শিব ছাড়া অন্য কাউকে তো তিনি পতি হিসাবে ভাবতেও পারেন না | প্রতিজ্ঞা করলেন এবার, চির কৌমার্য্যের ব্রত |

এদিকে বাণাসুর আসছে ধেয়ে , কেবলমাত্র দক্ষিণের এই দিকটাই তার জয় করতে বাকি | কন্যাকুমারীর মুখোমুখি হলো বাণাসুর আর রূপ দেখে মুহূর্তের মধ্যে বিমোহিত হয়ে গেলো সে | ” আমি ত্রিভুবনের অধিকারী বাণাসুর , তোমার পাণি প্রার্থনা করি |”
কঠোর হাসির ধিক্কারে বাণাসুরকে থামিয়ে দিলেন কন্যাকুমারী | অপমানিত বাণাসুর জোর করে কুমারীকে গ্রহণ করতে অগ্রসর হলেন | মুহূর্তে কন্যাকুমারী ক্রোধে নিজের মহাশক্তির রূপ ধারণ করলেন | যুদ্ধে পরাজিত হলো বাণাসুর, দেবী তাঁর চক্র দিয়ে অসুরকে বিনাশ করলেন |দেবকুল রক্ষা পেলো , স্বর্গরাজ্যে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলো দেবতাদের সিংহাসন |

কন্যাকুমারী কিন্তু রয়ে গেলেন নিজের জায়গাতেই , সেই ত্রি-সাগর সঙ্গম কুমারিকায় |চির কুমারী আবার নিমগ্ন হলেন চির বাঞ্ছিত দেবাদিদেব মহাদেবের ধ্যানে | শিবের আসন চির প্রতিষ্ঠিত হলো সুচন্দ্রিমে , সেখান থেকে তিনিও অপলক দৃষ্টিতে তিনিও চেয়ে রইলেন তপস্বিনী কন্যাকুমারীর ধ্যানরতা মুখের দিকে | শুধু শিব না , আরো একজন চেয়ে বসেছিলেন এই দেবীর মুখের দিকে আর পেয়েছিলেন দেবীর প্রাণভরা আশীর্বাদ |

তুষার কিরীটি হিমালয় থেকে ভারতের প্রিতিটি প্রান্তের মৃত্তিকাকে স্পর্শ করতে করতে তিনি নেমে এসেছিলেন একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে | কত দেব দেবীর দর্শন করেছেন, সাধু-মাহাত্ম্যের সঙ্গ লাভ করেছেন | রাজপ্রাসাদে ও বাস করেছেন আবার পর্ণ কুটিরেও , কত স্তুতি পেয়েছেন আবার কত তিরস্কার ও | ক্ষুধা-তৃষ্ণায় জর্জরিত হওয়াও বাদ যায়নি , কিন্তু অনুভব করেছেন অখণ্ড ভারতের হৃদস্পন্দন , তার থেকেও বেশি অনুভব করেছেন জাতিভেদে জর্জরিত দরিদ্র মানুষদের অসহায়তার কথা |

ঠিক এই সময়ে অন্তরে শত চিন্তা নিয়ে কন্যাকুমারী দেবীর দর্শনের পরে , মন্দিরের অদূরে এক শিলাখন্ডে ধ্যানমগ্ন হলেন তিনি | সাঁতরে গিয়ে ভারতের সেই শেষ ভূমিখন্ডে বসে তাঁর মানসচক্ষে ভেসে উঠেছিল অতীত, বর্তমান, ভবিষৎ |নতুন আলো পেলেন অন্তরে , পেলেন পথের সন্ধান , হৃদয়ে শুনতে পেলেন গুরুর কণ্ঠস্বর |

গুরুভ্রাতাদের জানিয়েছিলেন এক চিঠিতে , ” কুমারিকা অন্তরীপে মা কুমারীর মন্দিরে , ভারতবর্ষের শেষ প্রস্তরখন্ডের উপর বসে ভাবতে লাগলাম – এই যে আমরা এতো জন সন্ন্যাসী আছি , ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি , লোককে দর্শন শিক্ষা দিচ্ছি -এসব পাগলামি | খালি পেটে ধর্ম হয় না -গুরুদেব বলতেন না ? এই যে গরিব গুলো পশুর মতো জীবন কাটাচ্ছে , তাঁর কারণ মূর্খতা ….” ইত্যাদি |

ভারতের দুর্গতদের উদ্ধারের চিন্তা তাঁর অন্তরে উদিত হলো | দেবীর আশীর্বাদে হৃদয় প্রশান্তিতে ভোরে গেলো ,আনন্দে নেচে উঠলো প্রাণ | ” আমার ভারতবর্ষ , আমার প্রিয় ভারতবাসী ” , এই কথা বলে দেবীর কাছে বর চাইলেন , ” জননী , আমি মুক্তি চাইনে | দেশমাতৃকার সেবাই আমার জীবনের একমাত্র ব্রত |” চিনতে পারছো কি , এই মহান সন্ন্যাসীটিকে ? তিনি অন্য কেউ নন , আমাদের স্বামীজী |

Tagged , , , ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →