my stories

নাকছবি

আধা-মফস্বল জায়গায় বড়ো হয়েছি| সেখানে মেয়ে জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে তাকে কখন নাকের-কানের পরানো হবে সেটা নিয়ে ভাবা গুরুতর বিষয়| আর এগুলো পরতে হলে অবশ্যই ফুটো করতে হবে | তখন পার্লার এ গিয়ে কান-নাক ফুটো করার চল ছিল না | ভরসা ছিল শক্ত হাতের মাসি/পিসি/দিদা/ঠাকুমার উপর, তা সে নিজের হোক বা পাড়ার| কানের দায়িত্ব নিয়েছিল ঠাকুমা| সময়মতো করিয়েও দিয়েছিলো সে নিয়ে আমার কোনো স্মৃতি নেই মানে কখন, কিভাবে এইসব আর কি | শুধু যখন আয়নায় মুখ দেখতাম , দেখতাম আমার মতোই দেখতে কে একজন যেন দুকানে দুটো সোনার ছোট্ট রিং পরে আছে |
গোলটা বাধলো নাকফুটো করা নিয়ে| তখন আমার বয়স হয়তো ছয় বছর|মনে পরে মায়ের সাথে মামারবাড়ি গিয়েছিলাম|যদিও মামারবাড়ি যাওয়াটা আমার কাছে শাস্তিজনক লাগতো| না তাতে মামারবাড়ির লোকজনদের কোনো দোষ ছিল না | আসলে আমি ছিলাম আমার ঠাকুমাভক্ত| মানুষটা তখনকার দিনে প্রগতিশীলা ছিলো আর আমাকে প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবাসতো| না, দিদাও যে ভালোবাসতো না সেটা বলছি না | খুবই ভালোবাসে |আর আমার মামারবাড়ির ব্যাপারে অপছন্দের গন্ধটা টের পেয়ে হয়তো বা আরোই চেষ্টা করে কি করলে আমার সেখানে ভালো লাগবে| তবে নাকফুটো করার চিন্তা-ভাবনা টা সেখান থেকেই এসেছিলো কি না জানি না, আসতেও পারে |

হঠাৎ একদিন দিদা দেখলাম হাতে ছুঁচ-সুতো নিয়ে তৈরী| মায়েদের আলোচনাতে কানে এসেছিলো এরপর নাকি “নাকের পাটা ” শক্ত হয়ে যাবে, ফুটো করা যাবে না| আর নাকের ফুটো না থাকলে নাকছবি ও পরা যাবে না | সেই নাকছবি না পরলে নাকি শ্বশুরবাড়িতে উঠতে-বসতে কথা শুনতে হবে| সুতরাং দিদা আমার ভালো করার জন্য উদগ্রীব| কিন্তু আমার নাকের নোলক পরা জিনিস টা নিয়ে সেই বয়সেই বেশ অস্বস্তি ছিল| বন্ধুদের দেখতাম হয় নাকে নিমকাঠি, নয়তো বা সুতো ,নয়তো একটু বড়োসড়ো নোলক যেটা মা-ঠাকুমার ছোটবেলার সেইসব পরে স্কুল আস্তে | আর তাতে তাদের মুখগুলোই যেন পাল্টে যেত| তার উপর যদি কারো ওই জায়গায় ইনফেকশন হয়ে যেত তাহলে আর ও বিশ্রী ব্যাপার|

তাই দিদার ফাঁড়া থেকে বাঁচতে আমি খুব ছুটে লাগলাম , অবশ্যই বাড়ির ই মধ্যে|মামারবাড়িটা বেশ বড়ো ছিলো| বিশাল লম্বা বারান্দা আর আটটা বড়ো বড়ো ঘরের জন্য ছাদ টা ও ছিলো অনেক খোলা | আর ছিলো ছাদে উঠতে দুদিকে দুটো সিঁড়ি | আমি এদিকে উঠে অন্যদিকে নামছি ছুটে ছুটে যাতে দিদা না ধরতে পারে| কিন্তু ভালো কাজে সাহায্য করার লোকের অভাব ছিলো না| দিদার কাজটা সুস্থভাবে হয়েও গেলো| আমার ও কপালে জুটলো প্রথমে সুতো, পরে নিমকাঠি আর ও পরে ছোটো নথ| প্রথম কদিন তো মনের দুঃখে আয়নায় মুখ ই দেখতাম না, পরে যাইহোক সয়ে গিয়েছিলো| কিন্তু গোলমাল টা পাকলো যখনি ঠান্ডা লাগতো সেই সময়|

আমার আবার একটুতেই ঠান্ডা লাগার ধাত| তাই নাক দিয়ে সর্দি ঝরলে নথ পরে সেটা ম্যানেজ করা খুবই শক্ত কাজ| নাকটিপে সেটা করতে গিয়ে হাঁচি ও দু-চারটে যোগ হয়| তা দেখে দেখে ঠাকুমার মনে দয়া হয়| ঠাকুমার একটা খুব সুন্দর ছোট্ট মতো নাকছবি ছিলো, সাদা পাথরের,হীরের নয়, সেটা আমাকে দিলো পরতে যাতে আর ঠান্ডা লাগার সময় কষ্ট নাহয়| আমিও খুশি ছিলাম কারণ নাকছবিটা আমার মনের মতো হলো| বেশ কিছুদিন পরেও ছিলাম| একদিন ছুটির দিনে বাবার পশে বসে চলছে পড়াশুনার কাজ,খোলা বারান্দায় মাদুর পেতে সকাল বেলায় | বাবার কাছে খুব বেশি বকা খেতাম না কিন্তু কিছু একটা জানা জিনিস ভুল করেছিলাম বলে সেদিন ছাড় পেলাম না | বাবার বকুনিতে অভিমানী মেয়ের চোখ দিয়ে টপ-টপ জল পরা শুরু | চোখ ভিজে গেলে নাক আর কতক্ষন শুকনো থাকে? আর সেই অবস্থা সামলাতে ঠাকুমার নাকছবিটা রাখলাম খুলে পাশে|মুখ নামিয়ে বসে আছি , দেখলাম হঠাৎ কোথা থেকে একটা চড়ুই পাখি এসে আমার পাশে এসে বসেই উঠে গেলো |
পরে বাবার দুটো আদরের কথা শুনে কান্না থামিয়ে আবার পড়ায় মন দিলাম| মনে পড়লো নাকছবিটার কথাও| পাশেই তো রেখেছিলাম | পরতে গিয়ে দেখি আর খুঁজে পাচ্ছি না | খোঁজ, খোঁজ, সবাই মিলে খোঁজ | নাঃ, তার আর কোনো চিহ্ন নেই | সম্ভবত সেই চড়াই পাখি বালির দানা ভেবে মুখে করে নিয়ে চলে গিয়েছিলো| এরকমও হয়!!! কি আর করা যাবে?

ঠাকুমার ও কদিন খুব মন খারাপ হলো | যে নাকছবিটা নিজের মেয়েদের দেয়নি সেটা আদরের নাতনিকে দিয়েছিলো আর সেটা এমনি করে হারিয়ে গেলো| তবে ঘটনাটায় আমার ছোট লাভ হলো| এই যে এরপর থেকে আমাকে আর কোনোদিন নাকছবি পরতে হয়নি| নাকের ফুটো অবলীলাক্রমে বন্ধ ও হয়ে গেছে| আর এর জন্য শশুরবাড়িতে ও আমাকে কোনো কথা শুনতে হয়নি কারণ সেখানে শাশুড়ি, ননদ কেউই নাকছবি পরে না| সব ভালো যার ……..

photo: google

Tagged , , , , ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →