story

প্রিয় ভ্যালেন্টাইন

এই এডভার্টাইজিং অফিসটায় আজকের মতো ছুটি হবো হবো , হাতে আর সময় নেই কিন্তু মনামিকে হাতের কাজটা শেষ করতেই হবে | আসলে হয়েও যেত কিন্তু তার কো- ওয়ার্কার আজ তাকে ম্যানেজ করতে বলে একটু আগেই কেটেছে ,কেটেছে বয়ফ্রেন্ডের সাথে সময় কাটাবে বলে | মনামি মুচকি হেসে পারমিশন ও দিয়ে দিয়েছে | দিয়েছে কারণ ওই রকম দিনতো সেও কাটিয়েছে তাই তার মর্ম সে ভালোই বোঝে | রজতের সাথে এই স্পেশাল দিনটার প্রতি মুহূর্ত কাটাতে সে কেমন উদগ্রীব হয়ে থাকতো সেটা মনামি এখনো চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পায়|

**********************************************

সেই ক্লাস ইলেভেন থেকে একসাথে ছিল দুজনে | হয়তো খুব তাড়াতাড়ি ই ছিল কিন্তু মনামি জানে যখনি ও প্রথম রজত কে দেখে ঠিক তখনি তার ওকে অনেকদিনের চেনা মনে হয়েছিল , মনে হয়েছিল সত্যি কারের ” সোল মেট “| প্রথমে তারা বন্ধু হলো , পরে মনামি ই প্রথমে তার ফিলিংস এর কথা রজতকে জানিয়েছিলো | প্রথমে রজত তেমনভাবে সারা না দিলেও পরে এক্সেপ্ট করে নিয়েছিল | কেমন ফুরফুরে ছিল সেই দিনগুলো , স্কুল শেষ করে একই কলেজে এডমিশন ও নিয়েছিল দুজনে | নিজের পড়াশুনার খরচ জোগাতে মনামি একটা ছোট গোছের কাজ ও জুটিয়ে নিয়েছিল | কিন্তু তাতে সমস্যা হয়েছিল যে তাদের একসাথে সময় কাটানোর পরিমান যাচ্ছিলো কমে |

প্রথম রজত রাগ করতো , পরে ভুল বোঝা শুরু করলো আর শেষে তো সন্দেহও করতে থাকলো | এর সাথে মিশছো কেন? ওর সাথে কথা বলছো কেন ?কখন বাড়ি এলে? কখন বেরুলে এই সব প্রশ্নের মাত্রা দিন দিন বাড়তে লাগলো | মনামির প্রথম প্রথম ভালো লাগতো, উপভোগ করতো রজতের ভালোবাসার অধিকারবোধকে কিন্তু তার মেনে নেয়াটাকে রজতকে ইন্ধন জোগাচ্ছিলো আরো শক্তিশালী হতে | মনামি বোঝাতে চেষ্টা করতো তাদের ভবিষতের কথা ভেবেই সে আরো এই কাজটা করে যাচ্ছে কিন্তু রজত বুঝতে চেষ্টা করলে তো | এমনি করেই কলেজের ৩ বছরে ওদের প্রায় তিন-তিন বার ব্রেক আপ আর প্যাচ আপ হয়েছিল আর সমঝোতাটা বেশি মনামি ই করছিলো | করছিলো নিজের আত্মসম্মানকে বিকিয়ে দিয়েও কারণ তার মনে হতো সে রজতকে খুব ভালো বাসে | আসলে সে সময় বাড়িতে যেরকম অবস্থা ছিল তাই….
নাঃ এখন এই মুহূর্তে আর ভাববে না সে তাহলে তো কাজটা কমপ্লিট হবেই না | উঠে গিয়ে এক কাপ কফি নিয়ে এসে বসলো নিজের ডেস্কে | উল্টো দিকের ডেস্ক গুলোতেও একবার চোখ বুলিয়ে নিলো ,কম লোকজনই রয়েছে এখন | আসলে অনেকেই ইয়াং এখানে তাই আজকের দিনটায় ..

************************************************
চোখের চশমাটা ঠিক করে নিয়ে লগে পড়লো কাজে | চুলটা ছোট করে একটা বান ও করে নিতে হলো যাতে কাজের সময়টায় আর চোখে মুখে পরে ডিস্টার্ব না করে | তখনি অফিসবয় কার্তিক এসে জানতে চাইলো , ” ম্যাডাম আপনি কি আজকে এখনো থাকবেন ?”
মনামি তার চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলো একটা কেমন যেন করুনার ইঙ্গিত , হয়তো কথাটায় লুকানো মানে ছিল ,”আপনি কি কাউকে জোটাতে পারেননি ?”
চট করে মুখটা দেখে নিয়েই মনামি গম্ভীর করে উত্তর দিলো “আমার কাজ আছে জরুরি , দরকারে আরো ১০ মিনিট হয়তো বেশি থাকতে হবে |”
” আচ্ছা, ঠিক আছে | আমি রয়েছি |” কার্তিক চলে গেলো |
মনামি কাজটায় মন বসলো | আবার ডিসটার্ব , “এই মুহূর্তে ই কি সব হতে হয় !”, স্বগতোক্তি করে মনামি ফোনটা রিসিভ করলো |
” ম্যাডাম, তন্দুর থেকে বলছি | আপনি যে ডিনারের অর্ডারটা দিয়েছেন , রেডি আছে পিক আপের জন্য |”
“থ্যাংক উ , আমি আসছি আধ ঘন্টার মধ্যে “|
এবার ফোন,কফি সব সরিয়ে রেখে মনামি ঝাঁপিয়ে পড়লো কাজটা শেষ করতে | করেও ফেললো আধ ঘন্টার মধ্যে | কাজ শেষে বাথরুমে গিয়ে চোখে-মুখে জল দিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিলো সে | ব্যাগ, কার কি , মোবাইল সব গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লো | অফিসের কাছেই তন্দুর টা, সেখান থেকে খাবারটা নিয়ে ও নিলো আর পাশের বড়ো বেকারি শপ থেকে ৩তে কাপ কেক |

*************************************************

গাড়ি চালাতে চালাতে আবার সেই পুরানো কথা, এই দিনের কাটানো স্মৃতি গুলো ভিড় করে আসছে তার | এই দিনে একবার একটা মুভি দেখতে গিয়েছিলো রজতের সাথে , কিন্তু তার পরা কুর্তাটা রজতের মোটেই পছন্দ হয়নি বলে সারাদিন কথাই বলছিলো না ভালো করে |মনামির হাসি পাচ্ছিলো রজতের মুখ দেখে কিন্তু তার একটা সামান্য কথায় রজত পাবলিক প্লেসে যে ভাবে রিয়াক্ট করেছিল , মনামি তো কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি এসেছিলো সেদিন | আর তাকে না জানিয়ে যখন ব্যাঙ্গালোরের জবটা নিয়ে রজত জানালো যে সে চলে যাচ্ছে আর মনামির সাথে দেখা করতে চায় না তখন মেসেজটা দেখে মনামি তো চোখে অন্ধকার দেখছিলো | মনে হয়েছিল তার হার্ট বন্ধ হয়ে যাবে ,ভিক্ষা চাওয়ার মতো ফোন করে বার বার দেখা করার উপায় খুঁজছিলো কিন্তু রজত ফোন তোলেই নি |

কলিং বেল টিপতেই দরজা খুললো মা | এক গাল হাসি নিয়ে বললো ,” তোর ই অপেক্ষা করছিলাম “|
মনামির মনটা আলো হয়ে উঠলো |
“আবার কি নিয়ে এলি , আমি তো ডিনার বানিয়েছি |”
” প্যাকেট খুলেই দেখোনা “, এগিয়ে দিলো মায়ের দিকে |
” এতো আমার ফেভারিট বিরিয়ানি , গন্ধ পেয়েই বুঝেছি |” ” আর অন্যটায় কি ,এটা তো তোর ফেভারিট , কাপ কেক ”
” চলো খেয়ে নি তাড়াতাড়ি , জাস্ট একটু চেঞ্জ করে আসতে যা দেরি |” মায়ের গালটা টিপে মনামি চলে গেলো |
টেবিলে মাও প্লেট রেডি করে ফেলেছে | জব করে আসার পর মায়ের এই ছোঁয়া গুলো যে মনামির কত ভালো লাগে ,কাউকে বোঝাতেই পারবে না | মা অবশ্য মাঝে মাঝে চলে যাবো যাবো করে কিন্তু মাকে আটকে রেখেছে মনামি একটা কলেজে ভর্তি করে দিয়ে | মায়ের অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল যে গ্রাজুয়েট হবার | এটা সেটা নিয়ে গল্প করে খাওয়া শেষ করলো দুজনে | খাওয়া শেষে মা বসলো টিভি নিয়ে আর মনামি চলে গেলো নিজের ডেস্কে | কালকের একটু অফিস ওয়ার্ক যদি এগিয়ে রাখা যায় …

*******************************************************

কাগজ পেন নিয়ে বসে তো পড়লো কিন্তু মাথাটাই তো আজ কেমন এলোমেলো হয়ে আছে অতীতের ধাক্কায় | দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাগজের উপর আঁকি-বুঁকি কাটতে কাটতে কেমন করে যেন মনামির পেন চলতে লাগলো

” প্রিয় ভ্যালেন্টাইন ,
জানিনা আজ পর্যন্ত তোমায় কেউ চিঠি লিখেছে কি না , কিন্তু আজ আমার খুব লিখতে ইচ্ছা করছে | তুমি এতো ভালোবাসা বিলাও কি করে ? তুমি কি জীবনে অনেক ভালোবাসা পেয়েছিলে ? এসব আমি আগেতে ভাবতাম | ভাবতাম প্রথমে কারোর কাছ থেকে ভালোবাসা পেতে হবে তবেই অন্যকে ভালোবাসা যাবে | রজতই ছিল আমার একমাত্র ভালোবাসার সম্পর্ক , অকৃপণভাবে ভালো বেসেছিলাম তাকে | কিন্তু সে যখন আমাকে রিজেক্ট করে চলে গেলো , আমি যে কি ক্রাইসিসের মধ্যে দিয়ে গেলাম যদি জানতে পারতে |হয়তো তুমিও গেছো , আমার থেকেও অনেক বেশি গেছো তাইতো তুমি ভালোবাসার জন আর তোমাকেই জানাচ্ছি |
কিন্তু তখন জানতাম না আমিতো যাকে ভালোবাসার তাকেই ভালোবাসেনি তখন , সেই প্রিয় আমি টাকে | আমি আশা করে ছিলাম অন্যকেউ এসে আমার জিবনের ফাঁকটাকে ভরাবে , আমাকে ভালোবাসবে | ভুল করেছিলাম , নিজেকে সম্মান করা, ভালোবাসা স্বার্থপর চিন্তা ভাবতাম কিন্তু এখন বুঝেছি এগুলো কত দরকার | ব্রেক আপের পর জিদ করে নিজের পড়াটা শেষ করে এই এডভার্টাইসিং কোম্পানিতে জব নিলাম তখন এতো অপরূপ লাগতো যে কি বলবো | নতুন করে জেগে উঠলাম আমি |
চাকরি সামলে বাবার হার্টের অপারেশন করলাম, বোনকেও নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করলাম মাকে নিজের কাছে নিয়ে এসে তার অনেক দিনের পুরানো স্বপ্ন সত্যি করতে সাহায্য করলাম | নিজেকে এখন খুব সম্পূর্ণ বলে মনে হয় | আধখানা হৃদয় নিয়ে আরো একটা আধখানা হৃদয়ের আশায় বসে থাকি না একটা গোটা হৃদয় বানাতে কারণ পুরো হৃদয়টাই এখন আমার কাছে আছে | তবে এখনো আমি বিশ্বাস করি ভালোবাসায় ,তাইতো তোমার দিনটাকেও সেলিব্রেট করতে চাই | ধন্যবাদ তোমাকে |”

” কি লিখছিস কি ওতো মনোযোগ দিয়ে ?” চমকে উঠেছে মায়ের কথায় | ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো মা কখন তার পাশে এসে বসেছে সে খেয়ালি করেনি |
” এটা দেখ “, মা একটা হাতের প্যাকেট এগিয়ে দিলো |
” কি ব্যাপার , হঠাৎ !” এই বলে মনামি ঝটপট খুলে দেখলো তার প্রিয় বইটা যেটা কিনবো কিনবো করেও কেনা হচ্ছিলো না |
সুন্দর একটা হাসি নিয়ে মাকে অবাক চোখে জানতে চাইলো , ” তুমি কি করে জানলে ?”
মা ও তার চুলটা ঘেঁটে বললো , ” ওরে পাগলী , তুই যে আমার ভ্যালেন্টাইন |”
মনামি মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরলো , চোখ দিয়ে বইতে থাকলো জলের ধারা,নিঃশব্দে |

Tagged

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →