mythology

ঋষি মার্কন্ডেয়

শিবের খুব ভক্ত ছিলেন ম্রিকান্দু ঋষি আর ওনার স্ত্রী মরুধ্বতি | শিবপূজা করা আর চারিদিকে শিবের গুনগান করা ছিল তাদের জীবনের উদ্দেশ্য | তবে মনের মধ্যে একটা দুঃখ তাদের ছিল , সন্তান না থাকার দুঃখ | ভগবান শিব যদি সন্তুষ্ট হয়ে তাদের মনোকামনা পূরণ করে এই আশা নিয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনে শুরু করলেন ঘোর তপস্যা |

তপস্যায় প্রীত হয়ে শিব আবির্ভুত হলেন তাদের সামনে | ত্রিনেত্র ভগবানের ডাকে দুজনে লুটিয়ে পড়লেন মহাদেবের পায়ে | ভগবান ও ভক্তের আনন্দে প্রীত হয়ে বললেন ,” তোমাদের তপস্যায় আমি প্রীত, বোলো কি বর চাও |”
স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কথা খুঁজে পাচ্ছে না বলার কিন্তু অন্তরের ইচ্ছা তো ভগবানকে জানাতেই হবে নাহলে তা পূরণ হবে কি করে!
” আমরা একটা সন্তান প্রার্থনা করি প্রভু তোমার কাছে , আশীর্বাদ করুন “|
শিব কিছুক্ষন নীরব থেকে জানতে চাইলেন , ” কেমন সন্তান চাও ?”
ঋষি আর ওনার স্ত্রী বুঝতে পারেন না এমন প্রশ্নের কি উত্তর দেবে | মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে দুজনে ভগবানের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে |
শিব বললেন ,” মূর্খ সন্তান চাও নাকি বিদ্বান সন্তান ?”
শিবের এই রকম উত্তরের বদলে স্বামী-স্ত্রী হয়ে পরলেন আরো চিন্তিত | জেনে বুঝে কেউ কি মূর্খ সন্তানের কামনা করে ?
ভগবানের কাছেই তারা জানতে চাইলেন কেন এরকম বলছেন |

শিব জানান ,” যদি বিদ্বান সন্তান নাও তবে তার আয়ু হবে খুবই কম কিন্তু মূর্খ জনের আয়ু হবে অনেক |”
ঋষি ম্রিকান্দু আর ওনার স্ত্রী বুঝে গেলেন ভগবান তাদের কোনো পরীক্ষায় ফেলতে চান | তারা জানেন কত তপস্যা করেছেন একটা সন্তানের জন্য | কিন্তু মূর্খ সন্তান !
দুজনে বললেন , ” ভগবান আমাদের বিদ্বান সন্তান চাই , হোক না তার আয়ু কম , যতদিন থাকবে আমাদের সাথেই থাকবে আর বাকি জীবন তার স্মৃতি গুলো নিয়েই কাটিয়ে দেব |”
ভগবান হাসিমুখে সম্মতি জানিয়ে অদৃশ্য হলেন |
জন্ম হলো ঋষি পুত্র মার্কণ্ডেয়ের |

ঋষি মার্কেন্ডেয় সত্যি ই ছিল ভগবানের আশীর্বাদ ধন্য , খুব কম বয়সেই সমস্ত বেদ পরে ফেললো | মা-বাবার প্রতি ও ছিল অসীম শ্রদ্ধা | ভগবান শিবের ও একনিষ্ঠ ভক্ত ছিল সে শৈশব থেকেই , পারলে সারাদিন ই ভগবানের ভজন-বন্দনা করে কাটিয়ে দেয় সে | কিন্তু বিদ্বান ঋষিপুত্র খেয়াল করে তার পিত-মাতা যেন কোনো কিছু নিয়ে মনোকষ্টে থাকে | তার উপস্থিতিতে সুখী থাকলেও অন্তর থেকে কোনো কারণে যেন সর্বদা ভীত থাকে |
একদিন ষোড়শ বর্ষে পদার্পনকারী ঋষিপুত্র প্রশ্নটা করেই ফেললো বাবা-মা কে , ” তোমাদের এমনি দুঃখী দেখি কেন ?আমি কি কিছু ভুল কাজ করেছি ?”
পিতা-মাতা দুজনে একসঙ্গে বলে উঠলেন ,” না না , কেমন করে ভাবলে তুমি যে আমরা তোমার উপর অসন্তুষ্ট ?”
ম্রিকান্দু ঋষি বলতে থাকলেন ,” আমরা তোমাকে খুব ভালোবাসি , তোমার জন্য আমরা গর্বিত | পিতা হিসাবে তোমার থেকে ভালো সন্তান আমরা চাই ও না ,” কিন্তু বলতে গিয়ে তার গলা কাঁপছিলো |

ঋষিপুত্র ধৈর্য সহকারে শুনে যাচ্ছিলো | অন্যদিকে পিতা-মতো বলতে পারছিলো না পুরো ঘটনা | শেষে মা মারুদ্ধতি ছেলেকে খুলে বললেন পুরো ঘটনা ,” আসলে আমরা ভগবান শিবের কাছে একটা আশীর্বাদ পেয়েছিলাম ,….” আসতে আসতে সব কথাই বললেন তিনি |
সবটা শোনার পর ঋষিপুত্র বুঝতে পারলো কতটা মনের দুঃখ চেপে রেখে মা-বাবা তার আদর যত্ন করেছে | বাবা-মা কে সে বললো ,” তোমরা তো খুবই সাহসী | আমার মৃত্যু নিকটবর্তী জেনেও আমাকে এতো ভালোবেসেছো | কিন্তু আর চিন্তা করো না , আমি ভগবান শিবের কাছে প্রার্থনা করবো আর তিনিও আমার প্রার্থনা শুনবেন |”
পিতা-মাতার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, উৎসাহ দিয়ে বললেন , ” এগিয়ে যাও তোমার পথে,মহাদেব ঠিক ই শুনবেন তোমার কথা, আমাদের আশীর্বাদ রইলো তোমার সাথে |”

ঋষিপুত্র বসলেন মহাদেবের তপস্যায় , সমুদ্রের তীরে মাটি দিয়ে তৈরী করলেন এক শিবলিঙ্গ আর ঢেউয়ের গর্জনের শব্দের মধ্যেও গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে রইলেন | এদিকে মৃত্যুর দেবতা যম বুঝলেন মার্কেন্ডেয়র জীবন কাল শেষ হয়ে এসেছে , দূত পাঠালেন তাকে নিতে | যম দূতেরা এসে দেখতে পেলেন পবিত্র ঋষিপুত্রের দেহ থেকে নিঃসৃত এক জ্যোতিবলয় তাকে ঘিরে রেখেছে | তারা সেই দেহ স্পর্শ করতেই পারলো না | ব্যর্থ হয়ে তারা প্রভুকে জানালো , যম এবার নিজেই আসলেন ঋষিপুত্রকে নিয়ে যেতে |

যম , মৃত্যুদেবতার হাত থেকে কেউ ই রেহাই পায়না | অন্যদিকে ঋষিপুত্র এতটাই তপস্যায় সিদ্ধ যে তার উপস্থিতি সে নিজচোখে দেখতে পেলো |
” এই পৃথিবী থেকে তোমার বিদায় নেবার সময় হয়ে গেছে ,” যমের এই কথায় , মার্কেন্ডেয় আঁকড়ে ধরলেন শিবলিঙ্গকে , বললেন ,” আমি যাবো না তোমার সাথে, ভগবান শিব আমায় রক্ষা করবেন |”
যম বললেন , ” আমাকে তোমায় নিয়ে যেতেই হবে |” ঋষি মার্কেন্ডেয়র আত্মা কে বেঁধে নিয়ে যেতে যম দড়ি দিয়ে বাঁধবার চেষ্টা করলেন | মার্কেন্ডেয় চোখ বন্ধ করে একমনে শিবের নাম করে যাচ্ছিলো| তার মনে হলো যেন শিবলিঙ্গ নড়ে উঠলো , চমকিত হয়ে চোখ খুলে দেখলো তার সামনে ত্রিনেত্র ভগবান |

ভক্তের প্রতি অত্যাচারের জন্য শান্ত শিব তখন রুষ্ট মৃত্যুদেবতার প্রতি, ” কেন একে নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরী করেছো ?”
যম জোড়হাতে বললো , ” ভগবান তার আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে এই পৃথিবীতে |”
শিব জোর গলায় বললেন , ” সে চিরজীবন বাঁচবে ,আমি বলছি |” ক্রূদ্ধ শিব হাতের ত্রিশূল নিক্ষেপ করলেন যমের প্রতি , বক্ষ বিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হলো মৃত্যু দেবতার |

স্বর্গের অন্য দেবতারা প্রমাদ গুনলেন , ইন্দ্র সহ তারা এসে কর জোরে দাঁড়ালেন মহাদেবের সামনে , অবাক হয়ে দেখলেন নির্লিপ্ত ঋষিপুত্র মার্কেণ্ডেয়কে যে তখন ও শিবের নামগানে মত্ত | ইন্দ্র বললেন ,” ভগবান এই পৃথিবীর সংসার ভালোভাবে চালানোর জন্য মৃত্যু দেবতার অবশ্যই দরকার| জন্মানোর পর সবাই অমর থাকলে সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যাবে |”
ইন্দ্রের কথায় মহাদেব শান্ত হলেন | ” আচ্ছা, যম তার জীবন ফিরে পাবে যদি সে মার্কেণ্ডেয়কে রেহাই দেয় | এই ঋষিপুত্র ই হবে একমাত্র যে অমর হয়ে থাকবে |”
দেবতারা রাজি হলেন এই শর্তে , মৃত্যুদেবতা বেঁচে উঠলেন , সকলেই শিবকে প্রণাম করে ফিরে গেলেন |

এবার ভগবান শিব দেখলেন ঋষিপুত্রকে যে তখন ও অবাক বিস্ময়ে শিবের দিকে চেয়ে তার স্তবগান করে যাচ্ছে |
” বোলো তুমি কি বর চাও , আমি তোমার উপর খুব তুষ্ট |”
ঋষি পুত্র বললেন , ” ভগবান আমি তোমায় দেখতে পেয়েছি , আর এর থেকে বেশি কিছু চাই না এই জীবনে |”
ভগবান স্মিত হাস্যে বললেন ,” পিতা-মাতার কাছে ফিরে যাও , তাদের সেবা কর , শান্ত মনে পৃথিবী ঘুরে বেড়াও , আর যুগে যুগে এই ষোলো বছর বয়স নিয়েই তুমি বেঁচে থাকবে | আমার আশীর্বাদ সর্বদা তোমার সাথে রইলো |”
মার্কেন্ডেয় পিতা-মাতার কাছে ফিরে গিয়ে সব ঘটনা বললো, সকলেই খুব খুশি | ঋষি পুত্র এমনি করেই হয়ে রইলেন চিরঞ্জীবী যে চির কাল বেঁচে থাকে | পুরানে এই বিশ্বাস করা হয় যে এখনো তিনি এই পৃথিবীতে আছেন |
ভগবান শিবের যে মূর্তি তিনি পূজা করেছিলেন তার নাম হলো ,” কাল সংহার মূর্তি “, কাল মানে যম কে যিনি মেরেছিলেন | ঋষি মার্কেন্ডেয়র সৃষ্ট শিব মন্ত্র :

” ওম ত্রম্বকম যজমহে সুগন্ধিম পুষ্টি বর্ধনম , উর্বরাকমিব বন্ধনান , মৃত্যুরমুখশীয় মাহমৃতাত ” ,মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র রূপে প্রসিদ্ধ |

ঋষি মার্কেন্ডেয়র গল্প আমাদের শেখায় যে জিবনে হতোদ্যম হয়ে না বসে থেকে চেষ্টা করলে নিজের নিয়তিকেও জয় করা যায় |

Tagged , ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →