story

সারথি

অদভুত বাতিক রোগ আছে সমীরের , যখনি কখনো কোথাও গাড়ি করে যাওয়া হয় , সে অবশ্শই সামনের সিটে বসবে আর যত রকম ভাবে পারে ড্রাইভারের খুঁত ধরার চেষ্টা করে যাবে । গাড়ি চালানো নিজে জানে না , আবার শেখার ইচ্ছাও নেই কিন্তু যখনি কোনো অন্য ড্রাইভারের হাতে নিজের জীবন সোঁপে দেয় , ঠিক কেন জানি না তাকে মানে তার ড্রাইভিং স্কিল কে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না । এবার বেড়াতে গিয়েও তাই করে চলেছে । এখন না জানি কোন ড্রাইভারের বকুনি খাওয়া হবে কেজানে !
ভোর ভোর স্টেশনে নেমে চলেছে ভোপাল থেকে ইন্দোরের পথে ।

ট্রেনে শীতকালে এসি কামরায় যে কতটা ঠান্ডা থাকতে পারে , তার আন্দাজ ছিল না সমীরের ।ঘুমটা তাই পাকাপোক্ত হয় নি , অনেক ঢাকা নিয়েও তাই মেজাজটা সকাল থেকেই বেশ খিঁচড়ে । বৌয়ের দিকে একবার তাকিয়ে ওঠাবার চেষ্টা করলো ,জ্যাকেট পরে জমিয়ে ঘুমাচ্ছে যখন থাক ,করে ছেড়ে দিলো । নিজেও উঠবো উঠবো করছে সেই সময় ফোনটা এলো ।

” স্যার , আপনি কি এসে গেছেন ? আমি আর ১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছাবো “, সমীর উত্তর দেবার আগে একবার ঘড়ি দেখে নিলো । এই সময়েই তো ট্রেনটা পৌঁছে যাবার কথা , তবে কি লেট চলছে ?
” না , না , আমরা এখনো আসিনি , ট্রেন লেট চলছে মনে হয় । আমি আপনাকে কিছুক্ষন পর জানাচ্ছি ।”
এই প্রথম ড্রাইভারের ব্যাপারে বেশ খুশি হয় উঠলো , অন্য সব জায়গায় তো নিজেকেই ফোন করে জানতে হয় যে তারা কত দূরে আর এ যে নিজে ই ফোন করছে আবার স্টেশনে আসছেও একেবারে ঠিক সময়ে ।
ইন্টারনেট সার্চ করে দেখে নিলো সমীর যে ঠিক কখন ট্রেন ভোপালে পৌঁছাচ্ছে,কল ব্যাক করলো ড্রাইভারকে ।
” মনে হচ্ছে ১ ঘন্টা ডিলে হবে , আপনাকে একটু ওয়েইট করতে হবে , সরি “।
” আরে , না না , ওই সময় টুকু অপেক্ষা করে যায় , কোই বাত নাহি ।”
ট্রেনটা আজকে ভালোই ঝোলালো ,এক ঘন্টা কি ,তার জায়গায় ২ ঘন্টা লেট করলো । ট্রেন থেকেই একটা কুলি দেখে নিয়ে সমীররা ছুটলো ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে ।
” হ্যালো, আপনি কি এখনো আছেন ? আমাদের একটু বেশি ই দেরি হয়ে গেলো ।”
” হ্যান , আছি ,এই স্ট্যান্ডে এসে আমাকে ফোন করুন, আমি গাড়ি নিয়ে সামনে চলে আসবো।”
গাড়িতে মালপত্র রেখে , সিটে বসে সমীর হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো । তার ভয় হচ্ছিলো যদি ড্রাইভার চলে যায় তো তখন কি করবে ! ” থ্যাংকু ভাইয়া , আমাদের জন্য অপেক্ষা করার জন্য ।” ” আরে না, এটা তো আমাদের ডিউটি । আমি চলে গেলে আপনাদের খুব অসুবিধা হতো আমি জানি , তাইতো রয়ে গেলাম ।”
সমীর আবার ভিতর ভিতর খুশি হয়ে উঠলো , কেন জানি না এই ড্রাইভারটাকে তার খুব ভালো লাগছে ।

একটু ক্ষণ যাবার পর ই সে একটা বড়ো মিষ্টির দোকান দেখে থামলো , ” দাদা , আমরা শহর ছেড়ে বেরিয়ে গেলে , ভালো খাবারের দোকান পাওয়া যাবে না । যদি ভুক লাগে এখানে কিছু খেয়ে নিন ।” সত্যি ই তো পেটে খিদেটা চনমনে হয়ে রয়েছে , এখুনি কিছু খাওয়া দরকার । সমীর ছুটলো দোকানে পছন্দ সই খাবার কিনতে । কিনে এনে আবার মনে মনে সে ড্রাইভারের প্রশংসা না করে পারলো না । লোকটিকে এবারে ভালো করে দেখলো সমীর । মধ্যবয়সী , কিন্তু পরিপাটি পোশাক , চোখে-মুখেও সতর্কতার ছাপ স্পষ্ট ।গাড়িটা ও পরিষ্কার-পরিছন্ন করে রেখেছে ।
সমীর গরম গরম কচুরি নিয়ে এসেছে, ড্রাইভারকেও খেতে বললো কিন্তু সে বললো বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে এসেছে ।

সুন্দর হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি ছুটে চললো , বেশ দক্ষ আছে ড্রাইভার । এই প্রথম সামনে বসে ও সমীরের চোখ বন্ধ হয়ে আসছিলো । হয়তো ট্রেনে ভালো করে ঘুম হয়নি তার ই জন্য । এখন সকাল ৭টা , অথচ আকাশ ঘন কুয়াশায় ঢাকা , সামনের জিনিস ও দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে । সমীরের ভয় ভয় লাগা শুরু হলো , না জানি কখন এক্সিডেন্ট হয়ে যায় , এদিকে খেয়ে–দিয়ে নিজের চোখে ও ঘুম জড়িয়ে আসছে , আটকাতেই পাচ্ছে না । বুঝলো , ঘুম আটকানোর উপায় হচ্ছে কথা বলা । ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো , পিছনে স্ত্রী ও ঘুমে ঢুলু ঢুলু । গলা খাঁকারি দিয়ে , সমীর ড্রাইভারের সাথেই কথা বলা শুরু করলো ।
“বলছি , তুমি কটাই উঠেছ ? ”
” এই ভোর তিনটে , আমাদের জায়গা থেকে স্টেশন আসতে ২ ঘন্টা লাগে কি না ।”
” ঘুমিয়ে পরবে না তো ?”
” আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন , অভ্যাস আছে । বরং আপনার ঘুম এলে ঘুমিয়ে পরুন ।”
সমীর হতচকিত , বলে কি লোকটা । ড্রাইভারের পাশে বসে ঘুমালে তার নিজের ও ঘুম আসবে আর তখনি এক্সিডেন্ট হবে । আর রাস্তার যা অবস্থা !!
” কি ভাবছেন , চিন্তা নেই । আপনি বিশ্রাম নিন , আমি আপনাকে ঠিক পৌঁছে দেব ।”
” গল্প করতে ভালোই লাগছে , ” সমীর নিজেকে চিন্তামুক্ত করার চেষ্টা করলো ।
” তা করুন ।”
ঠিক এমনি সময় উল্টোদিক থেকে হঠাৎ দুটো সাইকেল গাড়ি সামনে এসে পড়লো , তীব্র ক্ষিপ্রতায় ড্রাইভার পাস্ কাটিয়ে এগিয়ে গেলো । সমীর কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করে নিয়েছিল । চোখ খুলে এখনো সামনে কুয়াশা আর ধোঁয়াশাই দেখতে পেলো ।
” এই রকম আবহায়ায় ড্রাইভ করো কি করে ?” , আশ্চর্য হয়ে সমীর জানতে চাইলো ।
” বললাম না , অভ্যাস আছে । তেমন কিছু লেখাপড়া করিনি , কিন্তু শুনেছি গীতায় আছে অভ্যাসযোগের কথা ।”
” কত দিন গাড়ি চালাচ্ছ ?”
” কুড়ি বছর “, সামান্য হেসে ড্রাইভার বলে চললো , ” প্রথমে টেম্পো চালাতাম ।সেই সময় হাইওয়েতে চালাতে গিয়ে জীবনের প্রথম এক্সিডেন্ট দেখি , একটা ট্রাকের সাথে একটা স্কুটারের । দুজন ওখানে ই মরে গিয়েছিলো ।চারিদিকে রক্তের ছড়াছড়ি, লোকজনের কান্না-চিৎকার আর আমি তখন হতভম্ব ,ভীত । পরের দু-তিনদিন ধরে আমি না খেতে পারছিলাম, না রাতে ঘুমাতে পারছিলাম ।আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে এই ড্রাইভিংয়ের কাজটা কি করে করবো । আর এটা না করলে তো আমার সংসার ও চলবে না ।”
সমীর চুপচাপ শুনে যাচ্ছিলো । পিছন ফিরে দেখলো , স্ত্রী ও কথাগুলো গিলছে ।
এবার স্ত্রী ই জিজ্ঞাসা করলো , ” কি ভাবে নিজে বোঝালেন তখন ?”
ড্রাইভার বললো , ” আমার এক বন্ধু আমাকে বোঝালো যে সব কাজেই ঝুঁকি থাকে,অনেক সমস্যা ও থাকে । ঠিকঠাক কাজ করলে ভয় কি ? বরং নিজের ভয়কে কন্ট্রোল করো আর সাহসী হয়ে কাজে লেগে পরো ।”

” বন্ধুর কথায় একটা স্কুলের বাস-ড্রাইভার হলাম , শিশুদের নিয়ে যাওয়া-আসা করে বাড়লো আমার ধৈর্য্য আর কাজের প্রতি নিষ্ঠা ।এদিকে সংসার বাড়লো , পয়সার ও টান বাড়লো তাই এখন এই প্রাইভেট ট্যাক্সি চালাচ্ছি । তবে এখনো কোনো এক্সিডেন্ট দেখলে আবেগতাড়িত হয়ে পড়ি । জানেন তো , যারা গাড়ি চালায় তারা যত না এক্সিডেন্ট করে , অন্যদের কারণে এক্সিডেন্ট বেশি হয় । এই যেমন এখুনি হতে যাচ্ছিলো ।

ইচ্ছা থাকে , দায়িত্ব যখন নিয়েছি তখন ঠিক ই পালন করবো আর দরকারে সাহায্য করবো আর বাকিটা কপাল । তবে এক্সিডেন্ট অনেক কমবে যদি প্রতি লোক ই নিজেরা ড্রাইভিং শেখে , এই স্টিয়ারিং হোইলের পিছনে একবার বসে । কারণ তখন বুঝতে পারবে জীবনের দাম কতখানি । ”

সমীরের শেষ বাক্যটা খুব ভালো লাগলো , সত্যি ই তো সে ড্রাইভারের পাশে বসে তাদের নানা কথা বলে তাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছে , নিজের দোষটা ভেবেই দেখেনি । এভাবে তো যে কোনোদিন , যে কোনো সময় এক্সিডেন্ট হয়ে যেতে পারতো । না ,আর নয় , এবার বাড়ি গিয়ে ড্রাইভিং শিখতেই হবে । সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে এসে গেলো ইন্দোর , হোটেলে পৌঁছে দিয়ে গাড়ি চলে গেলো ।সমীর ভাড়ার সাথে কিছু টিপস ও দিলো ।
হোটেলে ঢুকতে গিয়ে স্ত্রী কে বললো , ” দেখেছো ,ড্রাইভারের নামটা জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেলাম ।” স্ত্রী বললো , ” আমি জানি , তুমি যখন মিষ্টি কিনতে গিয়েছিলে , আমি জেনে নিয়েছি ।”
সমীর জানতে চাইলো , ” কি ?”
স্ত্রী বললো , ” কৃষ্ণ “।

Tagged , ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →