story

সিরিয়াল

যুথিকা সকাল বেলায় ছেলে-মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে বেশ একটু ফাঁকা সময় পায় । যদিও তার কিছুক্ষনের মধ্যেই হাজব্যান্ড ও বেরিয়ে যায় । তার লাঞ্চবক্স প্যাক করে রেখে সে একটু বেরিয়ে পরে সকালের রোদ গায়ে লাগাতে । তবে একা একা নয় , বান্ধবী ও খানিক জুটিয়ে নিয়েছে সে ।আজকে কে জানে কেন , কেউ ই তার সাথে যোগ দিলো না ।

নিজের মনেই খানিক হাঁটলো , কিন্তু তার যে বকবক করতে করতে হাঁটাই অভ্যাস । তাই খুব বেশিক্ষন হাঁটায় মন দিতে পারলো না । চারিদিকে তাকিয়ে খানিক্ষন হাউজিং কমপ্লেক্সের চেয়ারে বসলো । একটু এদিক -ওদিক তাকিয়ে দেখলো কে কি করছে । হঠাৎ করে মনে পরে গেলো , আরে , ঘরের জন্য তো কিছু সবজি আর ডিম নেয়া দরকার । এগিয়ে চললো রাস্তার উল্টোদিকে বসা সবজির দোকানের দিকে ।

সবজির এই গুমটির কাছ থেকেই গত কয়েক মাস সবজি নিচ্ছে যুথিকা । আসে পাশে আরো দোকান আছে কিন্তু এই দোকানি টি দাম টা ঠিকঠাক নেয় আর রাখে ও তাজা সবজি ।
” বাঁধাকপি আছে ” ?
” আছে গো দিদিভাই , নেবে ? একটা গোটা নিয়ে নাও , সস্তাই পরবে ।”
” ছোট দেখে দাও তবে , কিন্তু কত করে কেজি নেবে ?”
” তাকিয়ে দেখো , বড্ডই ছোট পেয়েছি আজ কপি গুলো তাই প্রতিটার দাম কম ই রেখেছি । তবে তাজা আছে , নিয়ে যাও ।”
” আর কি লাগবে ? সজনে ফুল নেবে ? কচি ডাঁটা , সব আজকে এনেছি । নিয়ে নাও এই সময় , আবার ফুরিয়ে যাবে । আজকেই করে নিও ডাঁটা দিয়ে পাতলা ঝোল , এই চৈত্রের গরমে ভালো লাগবে ।”

যুথিকা হাসলো , এই দোকানিটা মেয়ে , দেখে মনে হয় অল্প বয়সী নাম জয়া আর ওই মেয়ে হয়ে জিনিসগুলো এমন করে বিক্রি করে যেন ওই বাড়ির গৃহিনী । বাড়ি গিয়ে কি দিয়ে রান্না করবে , কখন রান্না করবে , কার সাথে খাবে এইসব বলে বলে ক্রেতার মন নরম করে দেয় এমন যে সে কিনতে বাধ্য হয় ।
“আচ্ছা , দাও তবে । দামটা কিন্তু আমি পরে বিকালের দিকে দিয়ে যাবো , এখন ওতো টাকা আনিনি ।”
” বাবা , দিদিভাই লজ্জা দিয়ো না । তুমিও থাকছো আর আমিও থাকছি । আগে খেয়ে তো দেখো ।” সুন্দর হেসে বললো জয়া ।
” আর ডিম দাও ৬ টা , বেগুন দাও ৫০০ আর ওই শাক টা ।”

” আমাকেও দাও তো ওই শাক ।” যুথিকা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো মিতালি , একটু হাঁপাচ্ছে । আসলে এই আট মাসের গর্ভবস্থায় ও একটু মোটা হয়ে গেছে , অল্পেতেই হাঁফিয়ে ওঠে ।
” কি রে , আজকে হাঁটতে এলি না যে । আমি ই একটু এদিক ওদিক পায়চারি করলাম ।”
” আর বলিস না , শাশুড়ি এসেছে । মহিলার সকাল থেকে উঠে অর্ডারের শেষ নেই । এর মধ্যেই দুবার চা খাওয়া হয়ে গেলো । এদিকে এসেছে আমাকে দেখতে আর বসে বসে চা খাচ্ছে । দেখতে পারি না , জাস্ট ।” মিতালি বললো ।
” আসতে বলেছিস কেন , বেশ তো রান্নার লোক রেখে চালিয়ে নিচ্ছিস । নাতি-নাতনি হলে না হয় দেখতে আসতো ।” যুথিকা হালকা করে বললো ।
” আমি কি আর বলেছি , নিজের সোহাগী সন্তান মা , মা করে আহ্লাদ করছে । বাবা হতে যাচ্ছে অথচ খোকাগিরি আর থামছে না ।” মিতালি বেশ রাগত স্বরে বললো ।
” তা কদিন থাকবে-তাকবে কিছু বলছে ? ” যুথিকা জিজ্ঞাসা করলো ।
” আমার রাগ দেখে বুঝতে পারছিস না ? আরে , একেবারে নাতি-নাতনি দেখেই যাবেন মহিলা । আমার শান্তির বারোটা অথচ আমার কোনো কাজেই লাগবে না । লোকজনকে ফোন করে এমন করে বলছে যেন আমার কত সেবাই না করছে । ” মিতালি চোখ-মুখ ঘুরিয়ে বলে ।
” এখন থেকেই এরকম মাথা গরম করিস না , নিজের শরীরের খেয়াল রাখ , যে আসছে তার কথা ভাব ।” যুথিকার কথায় মিতালি বললো , ” ঠিক ই বলেছিস কিন্তু পারছি কই ?”

” যাকগে , এসব কথা বাদ দে । কালকে আদরিনী সিরিয়ালটা দেখলি ? শাশুড়িকে কি নাকানি চোবানি ই না খাওয়ালে বৃত্তা । আমি তো হাততালি দিয়ে উঠেছি । তুই ভাব কেমন শাশুড়ি , চায়ের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে বৌকে খাওয়াচ্ছে । ভাগ্যিস বৌ সেটা দেখে ফেলেছিলো , তা নাহলে কি হতো বল ।” মিতালি হাসতে হাসতে বলে ।
” বেশ জমেছে , আমি শুধু ভাবছি বৃত্তা কিছু শাস্তি কেন দিলো না শাশুড়িকে । সকলকে বলে দিলে , সবাই বুঝে যেত ।” যুথিকা বলে ।
” আরে , বলে দিলেই বুঝি সবাই বিশ্বাস করতো ? শাশুড়িরা যা ধড়িবাজ হয় জানিস না ,আমার নিজের শাশুড়িকে দিয়ে তো দেখছি ।” শ্বাস ফেলে বলে মিতালি ।
” না রে , শুধু তোর নয় , আমার শাশুড়ি ও কম যান না । একটু কম আসে আমার কাছে তাই , এলেই দেখতিস কত গল্প হতো । মাঝে মাঝে মনে হয় , শাশুড়ি নেই মানে মারা গেছে মা , এরকম ছেলের সাথে বিয়ে করলে হতো ।” যুথিকা বলে ।

” এই যে দিদিভাইরা ,তোমাদের জিনিসগুলো প্যাক করে দিয়েছি । এইটা তোমার আর এইটা ওনার ।” জয়া দোকানি একটু চেঁচিয়ে ই বললো ।
” কি গো ওতো চিৎকার করে বলছো কেন , আমরা তো সামনেই রয়েছি , আসতে বললেও ঠিক শুনতে পেতাম ।” মিতালি বললো ।
” না , তোমরা যা শাশুড়ি নিয়ে গল্পে মত্ত , আমার গলা কানে যাবে কি ? যা অমৃতকথা বলে চলেছো সকাল সকাল ।” জয়া টোন কাটে ।
” জয়া , এমনি করে বলছো কেন তুমি আমাদের । তোমার ওতো গায়ে লাগছে কেন ? আর তোমার ই বা ওতো কিসের দরদ ” , যুথিকা জবাব চায় ।

মিতালি আরো একটু এগিয়ে বলে , ” হাতে তো শাঁখা-পলা কিছু নেই , সিঁথিতে সিঁদুর ও নেই , বিয়ে তো বোধহয় করোনি । তুমি কি করে জানবে শাশুড়ি কেমন হয় ? ”
একটু অদ্ভুত হাসলো জয়া , তাচ্ছিল্যের হাসি , বুঝদারের হাসি , মায়াবী হাসি এইরকম অনেক কিছু মিশিয়ে দিলে যেমন হয় ঠিক তেমন ।
” ঠিক ই বলেছো দিদিভাইরা , আমি কি করে বুঝবো ? এই আমার যে বেশ দেখছো , সেটা বিধবার । সেই সাত বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল আমার , আর সোয়ামি ছিল চোদ্দ বছরের ।

শৈশব চুরি গিয়েছিলো আমার কিন্তু ফিরিয়ে দিয়েছিলো আমার শাশুড়ি ।
ছোট্ট কুঁড়ে ঘর আর তার উঠোনে খেলা, চুল বাঁধা , গল্প করা , আমার সব কিছুর সাথী হলো উনি । আরো একটা খুব মিল হলো আমাদের , বীজ পুঁতে গাছ বের করা , তাদের যত্ন নেয়া । আমি যখন দশ বছরের , তখন থেকেই আমি ব্যবসা করছি জানো ? শাশুড়ি আর আমি দুটো ঝুড়িতে চারা গাছ নিয়ে বড়ো রাস্তার ধারে বসতাম , বিক্রি করতাম , সংসারের খরচ ওঠাতাম ।
এমনি করে সময় কাটে আর তার মাঝেই আমি প্রথমবার মা হতে চললাম । আট মাস পর্যন্ত সব কাজ করতে পেরেছি , নিজেকে খুব শক্তিশালী লাগতো তখন । কিন্তু শাশুড়ি বকেঝকে বিশ্রাম নিতে বলতো । কি আদর-যত্নই না করতো সেসময় ।“

” বাবা , তুমি তো বেশ ভাগ্যবতী গো ” , মিতালি বলে ।
” আর ভাগ্য , হাজব্যান্ড কর্মী ছিল কিন্তু একটু একটু করে মাতাল হতে লাগলো । তবে শাশুড়ির ভয়ে কোনোদিন আমার গায়ে হাত তোলেনি । টাকার টানে ,আবার গাছ বিক্রি শুরু করলাম আর শাশুড়ি বাচ্ছাকে দেখতো । এমনি করে আরো দুটো বাচ্চা হলো , আর শাশুড়ি ই দেখে তাদের ।
হাজব্যান্ড তো একটা বিল্ডিং এ কাজ করতে গিয়ে চাপা পরে মারা গেলো । পার্টি থেকে কিছু টাকা দিলো আর সেই টাকা থেকেই এই দোকান দিয়েছি । শাশুড়ি এখনো আমার পাশে , না পাশে নয় , সাথে থাকে । মা র অভাব , বন্ধুর অভাব কোনোদিন বুঝতেই দেয়নি । বাড়ি ফিরেও আজকের দিনের সব গল্প তাকে না বললে আমার খাবার হজম হয় না । এবার বোলো , তোমাদের কথায় ,সত্যি ই কি আমার গায়ে লাগবে না ? ”
যুথিকা আর মিতালি নীরব ,হতভম্ব , কি উত্তর দেবে জয়ার কথার ? নিজেরাই লজ্জায় মরে যাচ্ছে । বিশ্বাস করতে পারছে না , এমন শাশুড়ি ও আছে এই পৃথিবীতে ।

Tagged , ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →