story

শিল্পী

দীপ্ত এই জায়গাতে প্রায়ই আসে , একটু খোলা হাওয়া নিতে | অফিসের ওই ছোট্ট কুবিকল গুলোয় থেকে থেকে কেমন যেন হাঁপিয়ে যায় সে | জায়গাটা সমুদ্রের কাছাকাছি , জলের শব্দ , নোনা হাওয়া সব মিশিয়ে মুহূর্তের মধ্যে তার সারাদিনের ক্লান্তি কাটিয়ে দেয় | অফিস ফেরত মনটা যখন তাজা হয়ে ওঠে তখন ও তার বাড়ি ফিরে যেতে মন চায় না তার | মনে হয় আরো ,আরো একটু ভরে নিই, কালকের জন্য , যদি কালকে না আসতে পারি |

গ্রাজুয়েশনের পর পরই চাকরিটা পেয়ে গেছে দীপ্ত | ভালো স্কুল , ভালো কলেজের পর ভালো অফিস , সব কিছুই এখনো পর্যন্ত ” ভালো ” শব্দের বন্ধনেই বদ্ধ হয়ে আছে | এর পিছনে অবশ্য বাবাকেই দায়ী করে দীপ্ত মনে মনে | ঠিক ই পড়েছেন , দায়ী করে মানে দীপ্ত এখনো পর্যন্ত ওর জীবনটাকে একটা অপরাধের মতোই দেখে | তাই বাবাকে “ধন্যবাদ ” না দিয়ে ” দায়ীই ” করে সে |

********************************************

ছোট থেকেই লোকজনকে বেশ নকল করতে পারতো সে | সহজেই , হবুহু অন্যের গলা ও নকল করে কতজনকে ধাঁধা লাগিয়ে দিয়েছে, আশ্চর্য্য করে দিয়েছে ,হাসিয়েছে | এই গুনটার জন্য বন্ধু মহলে , আত্মীয় মহলে এমনকি এই নতুন অফিসের মধ্যেও সে জনপ্রিয় হয়ে গেছে | আসলে লোকজনকে খুব ভালো করে অবজার্ভ করা , তাদের চলন-বলন দেখা এসব যেন তার রক্তে | যে কোনো চরিত্রের মধ্যে সে যেন ঢুকে যায় , বুঝতে পারে এই নেশাটা তার রক্তে |

স্কুলে একবার একটা নাটক হয়েছিল , সেখানে খুবই কম সময়ের মধ্যে তাকে এক পাগলের ভূমিকায় অভিনয় করতে হয়েছিল | টিচাররা তো বটেই , বাকি যারা দেখেছিলেন তারাও পর্যন্ত অনেকদিন ভুলতে পারেননি সেই চরিত্রটা | তার পর আর সেইভাবে কোথাও অভিনয় করা হয় নি | কিন্তু দেশ বিদেশের সিনেমায় বুঁদ হয়ে থাকা, অভিনয় নিয়ে নানা আর্টিকেল দীপ্তর ঠোঁটস্থ |

কালেক্ট করে রেখেছিলো পৃথিবী জুড়ে কোথায় , কোন উনিভার্সিটিতে কি ধরণের কোর্স রয়েছে অভিনয় নিয়ে |বারো ক্লাস পরীক্ষার পর প্রতাপশালী বাবাকে , অনেক সাহস জাগিয়ে বলেও ছিল দীপ্ত , তাঁর ইচ্ছাটা | বিদঘুটে ইচ্ছাটা মাথা থেকে বের করার উপায় হিসাবে বাবা একটা গিটার কিনে দিয়েছিলো আর তাকে ভর্তি হতে হয়েছিল এক ইন্জিনিয়ারিং কলেজে | চার বছর পর এই মুম্বাই এ চাকরি , কলকাতা থেকে চলে এসে মুক্তি -স্বাধীনতার মাঝে মাঝেই যেন এক পরাধীনতা গ্রাস করে চলেছে দীপ্তর মনকে | মাঝে মাঝে তার মনে হয় সে বুঝি অবসাদ গ্রস্ত হয়ে পড়ছে | তাই এই মেরিন ড্রাইভে এসে মন জুড়ানো হাওয়া খাওয়া |

********************************************

গত দু-তিন দিন ধরে একটা জায়গায় বেশ ভিড় দেখছে সে, উঠে গিয়ে দেখতে ইচ্ছা করে কি ব্যাপারটা কিন্তু করে ওঠেনি সেটা | আজকেও দেখছে বেশ কিছু কিশোর-কিশোরী ঘিরে রয়েছে একজনকে |একবার তো দেখতে হচ্ছে , বলে এগিয়ে গেলো দীপ্ত | একজন বৃদ্ধ মানুষ , দীপ্ত ভালো করে দেখলো মানুষটিকে , না না , যতটা বৃদ্ধ বলে মনে হচ্ছে ঠিক ততটা ও বয়স নয় | মনে হচ্ছে জীবনের অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা তার বয়সটাকে বাড়িয়ে দিয়েছে | চারপাশের ছেলে মেয়েগুলো তার সামনে পোজ দিয়ে বসছে আর সে সুন্দর করে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে এঁকে দিচ্ছে | ২০০ করে টাকা দিয়ে ছবি নিয়ে ছেলে মেয়েগুলো হাসি হাসি মুখে চলে যাচ্ছে নিজের ছবি নিয়ে | দীপ্তর মনে হলো , নিজের ও একটা আঁকিয়ে নেয় কিন্তু আজকে মনে হচ্ছে আর সময় হবে না | অগত্যা…

পরের দিন ও মনে করে হাতে একটু সময় নিয়ে এলো , যদি একটা ছবি আঁকানো যায় | সুযোগ ও হয়ে গেলো , আঁকাতে গিয়ে অদ্ভুত করে লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে দীপ্তর যেন মনে হলো তাকে কোথায় যেন সে দেখেছে | একটু একটু করে কথা বলা শুরু করলো , মানুষটি প্রথমে কিছুই বলছিলো না , ছবিটি আঁকা শেষ করে দীপ্তর অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়া শুরু করলো |

********************************************

” তখন আর কত , এই তোমার মতোই বয়স ছিল আমার , পড়াশুনা করার ও ইচ্ছা ছিল খুব | কিন্তু কিছু অসৎসংগে পরে একটা ভালো পরীক্ষায় ফেল করলাম | এখনো মনে পরে , পরীক্ষার খাতায় খাতায় কত কিছু যে এঁকেছিলাম …., যিনি দেখেছিলেন , কি ভেবেছিলেন কে জানে !!
বাড়ির অবস্থা তেমন ভালো ছিল না , বন্ধুদের সাথে সময় কাটিয়ে কাটিয়ে রাত করে বাড়ি ফিরতাম | বাড়ির লোকজন বেশিদিন সহ্য না করতে পেরে , বাড়ি থেকে তাড়িয়েই দিলো | এদিক -ওদিক কিছু আজে-বাজে কাজ জুটিয়ে নিলাম , আর ডুবে থাকতাম মদের বোতলে , ওতেই শান্তি পেতাম |

এমনি করেই চলে যাচ্ছিলো দিনের পর দিন | হঠাৎ একদিন মত্ত অবস্থায় এক নর্দমায় পরে গেলাম | কতক্ষন সেখানে ছিলাম জানি না , জ্ঞান হলে দেখলাম হাসপাতালে রয়েছি | পায়ের অবস্থা বেশ খারাপ , হয় সার্জারি করতে হবে , নয় কেটে বাদ দিতে হবে | টাকা পয়সাও নেই, লোক জন ও নেই , কি আর হবে | ডাক্তাররা কোনো রকমে ব্যান্ডেজ করে ছেড়ে দিলো | আর আমি , “..একটু স্মিতহাস্যে মুখ ভরে লোকটি জানালো সে হয়ে গেলো ” ভিখারি “|

” বলতে পারো ভিখারি হতে কার ভালো লাগে ? তখন চলছিল গণপতির পূজা , এক বড়ো মন্দিরের পাশে বসে ভিক্ষা করছিলাম | অবসর সময় কাটাতে , কি মনে করে হাতে তুলে নিয়েছিলাম একটা কাগজ আর একটা পেন্সিল | আঁকা শেষ হবার পর হঠাৎ দেখি , একটি লোক ভিক্ষা দেবার পর সেই ছবিটি নিতে চাইলো | আমি অবাক হয়ে গেলাম | তাকে বিনা পয়সায় দিয়েও দিলাম | পরের দিন থেকে আরো একটু বেশি করে আঁকতে লাগলাম | অনেক লোক ই ছবিগুলো দেখে আর কিনতে চায় , বিক্রি করা শুরু করলাম | মনে হলো ভগবান একটা চলার রাস্তা দেখালো |
আঁকতে আঁকতে হাত খুলে গেছে , এখন অনেক বিখ্যাত লোকেদের ও স্কেচ আঁকি , পোর্ট্রেট | এই একই জায়গায় বসি যাতে লোকেদের চিনতে সুবিধা হয় | সবথেকে খুশি সেদিন হয়েছিলাম যেদিন অমিতাভ বচনের এক ফ্যান তার ফটো নিয়ে এসে আমাকে দিয়ে আঁকিয়ে নিলো আর বললো সেটা নাকি সে বচন সাবের জন্মদিনে গিফট করবে | পরে একদিন এসে আমাকে একটা ফটো দেখালো যেখানে অমিতাভজি আমার আঁকা পোট্রেটটা হাতে করে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন | এর থেকে বেশি আর কি চাই ?

আসলে জানতো , আমরা শিল্পীরা ,রক্তের সাথে শিল্প নিয়েই জন্মাই কিন্তু সেটা বুঝতে অনেক দেরি করে ফেলি | ধন্যবাদ ভগবানকে , আমার জীবনের লড়াই আমাকে ভগবানের দেয়া এই উপহারের কথা জানিয়ে দিয়েছে | নাহলে তো , এখনো হয়তো আমাকে ভিক্ষা করেই খেতে হতো , তাই না ? কিন্তু দেখো এখন , এখন পঙ্গু হলেও , আমি সম্মানের জীবন যাপন করছি….

********************************************

“আচ্ছা , দেখতো তোমার পোট্রেট টা কেমন হয়েছে ? ”

দীপ্ত কথা বলবে কি , তার যেন কোনো হুঁশ ই নেই | কোনো রকমে টাকা দিয়ে , পোট্রেট নিয়ে সে এক ভীষণ দোলাচল নিয়ে বাড়ি ফিরলো | ভাবতে থাকলো ওই মানুষটির শেষ কথা গুলো , ” ভগবানের দেয়া উপহার ” | এই জন্যই যে মানুষটিকে তার ও চেনা মনে হয়েছিল , এটা এক শিল্পী সত্তার সাথে আর এক শিল্পীর বন্ধুত্ব | আজকে রাত্রে অনেক্ষন ধরে ভাবলো সে , ঠিক করলো আর দেরি করবে না | কাল ই কোনো ভালো আক্টিং কোর্স করতে ভর্তি হয়ে যাবে সে , ছেড়ে দেবে এই চাকরি | মুম্বাইয়ের থিয়েটারে জয়েনও করা যেতে পারে ,অভিনেতা নয় ,শিল্পী হতে চায় সে |

Tagged , , ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →