story

শুভ দীপাবলি

রেস্টুরেন্টের দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে শঙ্কর | আজকেও ঠিক সময়েই এসেছে , সময়ের হেরফের করা একটুও পছন্দ নয় তার | পাঁচ মিনিট লেট্ হলেও যতটা কড়া কথা শুনতে হয় মালিকের কাছে ততটা বোধহয় মানুষ অন্য অনেক বড়ো অপরাধ করেও শোনে না | যদিও সকাল এগারোটায় ডিউটি তার কিন্তু সকাল থেকেই সে তৈরী থাকে আসার জন্য | রেস্টুরেন্টে এসে এখানের ড্রেস পরে নিয়ে সে নিজেকে বাইরের দুনিয়া থেকে পৃথক করে ফেলে | এই দশ ঘন্টার ডিউটি ই তার ধ্যান জ্ঞান তখন |

” আসুন স্যার , আপনাদের কি টেবিল বুক করা আছে ?”
মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক , সাথে পরিবার ছেলে-মেয়ে নিয়ে সামনে | শঙ্করের প্রশ্নে ভদ্রলোক একটু এলার্ট হয়ে জবাব দিলো ,” হ্যাঁ, করা আছে | ফোনে “| শংকর কাউন্টার এ গিয়ে ফিরে এসে ওনাদের একটা টেবিলে নিয়ে গিয়ে বসালো | সাথে মেনুকার্ড ও দিয়ে দিলো টেবিলে |
” সার , জল নিয়ে আসছি | আপনি ততক্ষন মেনু চয়েস করে নিন |”

কুড়ি বছর ধরে করে চলা এই রুটিন কাজে সে এখন লোক দেখলেই বুঝতে পারে কে কি রকম লাইফ-স্টাইল পছন্দ করে | তাই এখানে আর জিজ্ঞাসা করলো না ” নরমাল ওয়াটার নাকি মিনারেল ” , যেটা ও প্রথম প্রথম করতো আর লোকের মুখচোখ দেখে অপ্রস্তুতে পড়তো | কেউ কেউ তো আবার পেঁচিয়ে উত্তর দিতো যার জন্য মালিকের কাছে কথা শুনতে হতো | অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয় মানুষ, শংকর ও হয়েছে |

এরই মাঝে সে একবার ভালো করে খোঁজ নিয়ে এসে টেবিলের ভদ্রলোক কে ইশারায় আস্বস্ত করেছে যে সব রেডি | ভদ্রলোক ও খুশি তার এই উপস্থিত বুদ্ধি দেখে | আসলে আজ ওনার স্ত্রীর জন্মদিন | তাই রেস্টুরেন্ট এ খাবার পর সুন্দর একটা কেক কেটে সেলেব্রেশন করতে চান উনি , যাতে লেখা থাকবে ” আই লাভ ইউ”|

রেস্টুরেন্ট এ জব করতে করতে এই একটা জিনিস তার খুব ভালো লাগে | এখানে সবাই সবাইকে নিজের মনের কথা জানিয়ে কত আনন্দ পায় | যে শোনে সেও পায় | প্রেমিক-প্রেমিকা, নতুন বিবাহিতরা তো বটেই এমনকি বয়স্ক লোকেরাও আর এখন সঙ্গীর হাত ধরে ” হ্যাপি বার্থ দে ” বলতে লজ্জা পায় না |

ডিউটি থেকে ফিরে ঘরেতে একা একা যখন ঘুম আসে না , তখন মাঝে মাঝে সারাদিনের মানুষ গুলোর খুশির কথা ভাবে আর কখনো কখনো নিজের অজান্তেই ওদের জায়গায় নিজেকে রেখে স্বপ্ন দেখে | কোনোরকমে নাম সই করতে জানা শঙ্কর , বিহারের এক অজ গ্রাম থেকে ত্রিশ বছর আগে কলকাতায় চলে আসে টাকা রোজগারের তাগিদে | চায়ের দোকান, পানের দোকান করে করে অবশেষে এই রেস্টুরেন্ট এ চাকরি টা পায় | অনেকদিন থাকার ফলে সে খুব বিশ্বস্ত ও হয়ে গেছে , সাথে মাইনেও ভালোই দেয় | কিন্তু তাবলে এই বাজারে নিজের পরিবারকে কলকাতায় এনে রাখার মতো সামর্থ তার নেই | ওই মাঝে মাঝে ছুটি নিয়ে দেখে আসে বৌ, ছেলে -মেয়েকে আর ফোন এ তে টুকটাক কথা |

দেয়ালি তো একটা বড়ো উৎসব কিন্তু কোনোদিন ই মন হলেও সে ছুটি পাইনি বাড়ি যাবার | অবশ্য তার পরে ছট পূজায় সে যাবেই | নিয়ে যাবে নতুন জামা-কাপড় সবার জন্য , বৌ আর মেয়ের জন্য সুন্দর কাঁচের চুড়ি | কুড়ি বছর হয়ে গেলো তাদের বিয়ে হয়েছে | গ্রামে একা একা ঘর-সংসার তো সোনালি ই সামলাচ্ছে | ভারী ছিমছাম থাকে তার বৌ | যখনি যায় মনে হয় যেন এই তো কিছুদিন আগে বিয়ে করে এনেছে তাকে | ফোনে বেশি কথাও বলতে চায় না , শংকর যতটুকু জানতে চায় ততটুকুই উত্তর দেয় | উল্টোদিকে শংকর ই অনেক বকবক করে , সারাদিনের কথা |

তবে গ্রামে গেলে বুঝতে পারে ছেলে-মেয়েকে সোনালী কেমন আগলে রাখে , বাবা না থাকায় ও কোনো অটুট হতে দেয় না | ঘরের লক্ষ্মীশ্রী দেখেও তার চোখ জুড়িয়ে যায় | তখন আর কলকাতা ফিরতে ইচ্ছাই করে না তার | আধ হাত ঘোমটা দিয়ে বৌ পাশে-পাশেই থাকে , কখন কি শঙ্করের প্রয়োজন হয়ে পরে | দিনের বেলায় এখনো সে শুধু সোনালীর নখ ভাঙা-রুক্ষ হাত টুকুই দেখতে পায় , যাতে আবার মাঝে মাঝে লেগে থাকে রান্নার হলুদ ছোপ |

পরশু দেয়ালি , সেই পূজার মরশুম থেকে শঙ্করের হাঁফ ছাড়ার সময় নেই | টিপ্ ও ভালোই হয় এইসময় তাই ডিউটি তে কোনো ফাঁক রাখে না সে | ঘর ফিরতেও দেরি হয়ে যাচ্ছে , ক্লান্ত হয়ে দুদিন ফোন করে উঠতে পারেনি | দেয়ালিতেই সকাল সকাল করলো সে ফোনটা , ডিউটি যাবার আগেই | সোনালী ই ধরেছে , মিহি গলায় হলো বললো | শঙ্কর হেসে বললো , ” হ্যাপি দেয়ালি “| সোনালী ও আলতো করে বলে ,” হ্যাপি দেয়ালি জি “| শঙ্কর একটু উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে ,” আই লাভ ইউ “|

খিল খিলিয়ে ওঠা একটা হাসির স্বর এর সাথে ফোন কেটে যাবার শব্দ পায় সে | শঙ্কর ও মুচকি হেসে ফোনটা নিয়ে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু একটা অমলিন মুহূর্ত সে দেখতে পেলো না | ফোনটা কেটে তার বিয়ে করা , গোঁড়ালি-ফাটা, ঠোঁট-ফাটা, নখ -ফাটা “সোনালী ” বৌ আজ অনেকদিন পর আয়নায় নিজের মুখ ভালো করে দেখছে আর আয়নার সাইডে অবহেলায় রেখে দেয়া লাল রঙের গোল টিপটা সযত্নে কপালে পরে নিচ্ছে |

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →