my stories

ঠাকুমার গঙ্গাস্নান

আমার মতো মফস্বলী জায়গায় যৌথ পরিবারে বড়ো হওয়া অনেকেই হয়তো জানে যে ” গঙ্গাস্নান” ব্যাপারটা কত গুরুত্ত্বপূর্ণ ভাবে দেখা হয় | বিশেষ করে যদি পরিবারে পৌরাণিক কাহিনীর ভক্ত দাদু কিংবা সংস্কারী গোত্রের ঠাকুমা থেকে থাকে তবে তো প্রায় কথায় কথায় গঙ্গাস্নান করতে যাবার আয়োজন চলে | যেমন বিয়ের আগে পাত্র বা পাত্রীর গঙ্গাস্নান অবশ্যই পালনীয় | বৈশাখ মাস এলেই নাকি একবার ডুব দিয়ে আসতে পারলেই ভালো | শ্রাবনে একবার গিয়ে স্নান করে কাছাকাছি কোনো শিব মন্দিরে বেলপাতা-গঙ্গাজল দিতে পারলে তো পুন্য র শেষ নেই | ভাদ্র মাসের অমাবস্যায় তর্পন, আশ্বিন মাসে দুর্গাপূজার আগে গঙ্গাস্নান কর্তব্য | এমনি করে প্রতি মাসের সাথে আবার কিছু উটকো ব্যাপার যোগ থাকে | যেমন পরিবারের কারোর মৃত্যু , নতুন বাচ্চা জন্মানোর পর এইসব আর কি |

আমার ঠাকুমাও এইরকমই কিছুটা ছিল আর কি | মাঝে মাঝে শরীর খারাপের জন্য যদি নার্সিং হোমে ভর্তি হতো তো সেটাকে ও গঙ্গাস্নানের জন্য আর একটা বাহানা বানিয়ে নিতো | বলাবাহুল্য, বাবা-কাকুর পরিশ্রান্ত কান সেগুলোকে উপেক্ষা করে চলতেই বেশি ভালোবাসতো | কিন্তু ঠাকুমাও চুপচাপ বসে থাকার পাত্রী ছিল না | কাকে কি বলে, কেমন করে নিজের ইচ্ছা পূরণ করা যায় সেটা ঠাকুমা ভালোই জানতো | এমনকি এর জন্য দরকার হলে , ইংরেজিতে যাকে বলে ” ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল “, সেটাও করতো বেশ দক্ষ ভাবেই | যদিও হয়তো কাজটা না বুঝেই করতো কিন্তু করতো খুব ওস্তাদি ঢঙে |

আমার বাবাকে অফিসের কাজে মাঝে মাঝেই একটু আশেপাশে যেতে হতো আর তার জন্য একটা গাড়ি বরাদ্দ ছিল | গাড়ি মানে আম্বাসাডর | গাড়ির সাথে ছিল ড্রাইভার ও | এইবার যিনি ছিলেন , ” শ্যামল ” নামের মানুষটা বেশ হাসি-খুশি ধরণের ,মধ্যবয়সী আর সমস্ত জায়গা প্রায় হাতের তালুর মতোই চিনতেন | আমরা তো বটেই এমনকি ঠাকুমাও কিছুদিনের মধ্যেই তার সাথে বেশ পরিবারের একজন হিসাবে মিশতে শুরু করে দিয়েছিলো | আর একথা-সেকথার মাঝে নিজের গঙ্গাস্নানের ইচ্ছাটাও তার মাথায় চাপিয়ে দিয়েছিলো “ব্যাটা” বানিয়ে | তিনিও খুব একটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা না করে ঠাকুমাকে আশা দিয়েই রেখেছিলো যে সুযোগ পেলেই নিয়ে যাবেন |

একদিন সুযোগ এসেও গেলো | বাবাকে পাটুলি নামের কি একটা জায়গায় যেতে হবে যেখান থেকে নাকি গঙ্গা খুব বেশি দূর না | ঠাকুমার খুশি দেখে কে !! সঙ্গে অবশ্য আমাদের ও উপরি পাওনা হলো ঠাকুমাকে সাথ দেওয়া | ভাই তো সকাল থেকেই তৈরী হয়ে গাড়িতে ড্রাইভার কাকুর পাশে বসে গাড়ির যন্ত্রপাতি নিয়ে কৌতুহলী হয়ে পড়লো | অন্যদিকে আমার আর ঠাকুমার গোন্ডগোলটা বাধলো কে বসবে জানলার পাশে সেটা নিয়ে | যদিও দুজনেই মনের মতো জায়গা পেলাম কারণ মা মাঝে বসে ব্যাপারটা সমাধান করে দিলো | সত্যি বলতে সেটা ছিল আমাদের প্রথম ” রোড ট্রিপ “, মানে জ্ঞানতঃ আর কি |

মনে পরে সময়টা শীতকাল ছিল | যে জায়গাটা গেলাম সেখানে আবার ছিল একটা বড়োসরো সবজি হাট | শীতকালের নানান রঙের সবজি দেখে চোখ ছানাবড়া | এর আগে জানতামই না যে ওই ভাবে কেনাবেচা হয় | বাবার অফিসের কাজ মানে ছিল বেশ কিছু মিটিং আর মিটিং | সাথে খাওয়া-দাওয়া করার ব্যবস্থা ও ছিল | আমরা ড্রাইভার কাকুর সাথে একটু ওদিক ঘুরে , বাইরের দোকানে গরম বেগুনি খেয়ে , চারিদিকের গল্প শুনে সময় কাটালাম | শেষ পর্যন্ত বাবা যখন কাজ থেকে ছাড়া পেলো তখন প্রায় বিকেল |

এতক্ষনে আমরা চললাম গঙ্গার দিকে | শীতকালের বিকেল মানে খুব তাড়াতাড়ি সবকিছু ধোঁয়াটে হয়ে যায় | সন্ধ্যে যেন মাটিতে পা ছোঁয়াবে বলে তৈরী ই থাকে | আর তার জন্যই ঠাকুমা হয়ে পড়লো উদ্বিগ্ন | একের পর এক প্রশ্নবাণ চলতেই থাকে,” কোন ঘাটে চান করবে, কত দূরে , কাপড় ছাড়ার ব্যবস্থা আছে কি না , রাত হয়ে গেলে বাড়ি আসতে কত দেরি হবে ” এমনি সব আর কি | বাবা তো সারাদিন মিটিংয়ের পর বেজায় বিরক্ত উত্তর দিতে দিতে | অন্যদিকে শ্যামল কাকুও ক্লান্ত ড্রাইভিংয়ের ধকলে | হঠাৎ আমার বাবার মাথায় কিছু একটা দুষ্টু বুদ্ধি ভর করলো, শ্যামল কাকুকে কি বলেছিলো তখন ঠিক মনে নেই কিন্তু তার পর যা হলো সেটা জানা যাক |

বেশ অন্ধকার , আমরা গাড়িতে বসেই রইলাম মায়ের সাথে | বাবা, ড্রাইভার কাকু নিয়ে গেলো ঠাকুমাকে | প্রায় পনেরো-কুড়ি মিনিট পর ফিরেও এলো |মনে হলো বাবা খুব বেশি সময় দেয়নি স্নান করতে তার জন্য একটু মনঃ ক্ষুন্ন | কিছুটা সময় যাবার পর ঠাকুমার মনে নানা ধরণের খটকা শুরু হলো | আরো শুরু হলো কারণ বাবার নানারকম দুষটুবুদ্ধির সাথে ঠাকুমা পূর্ব-পরিচিত | তাই ঠাকুমার সন্দেহের কারণ গুলো হলো ,” আচ্ছা , এই জায়গাটার নাম কি , কেউ তো নেই দেখলাম আশেপাশে , ঘাট টাও তো খুব অন্ধকার , ভালো ও নয় “| এইসব প্রশ্ন বারবার জিজ্ঞাসা করতে করতে ঠাকুমা কারো কাছ থেকে উত্তর না পেয়ে যখন বিরক্ত তখন কেমন করে যেন ঠাকুমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে গেলো | উত্তরটা ঠাকুমাই বের করে ফেললো ,” আরে ওটা গঙ্গাই নয়, ওটা পুকুর |” বাবা আর শ্যামল কাকু এবার হোহোহো করে হেসে ফেললো | সত্যিটা জেনে আমাদের ও খুব মজা লাগলো | তবে শুধু ছাড় পেলো না ড্রাইভার কাকু | যা মনে হলো পরের বার হয়তো দিনের বেলাতেই নিয়ে যেতে ঠাকুমাকে গঙ্গাস্নানে |

Tagged ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →