mythology

উর্বশীর জন্ম

ঋষি ধৰ্ম আর পত্নী মূর্তির ঘরে ভগবান বিষ্ণু জন্ম নিলেন দুই পুত্র হয়ে , নাম হলো নর আর নারায়ণ | জন্ম থেকেই তারা ছিলেন শিব ভক্ত, বছরের পর বছর ধ্যান করতে লাগলো তারা “ব্রহ্ম” কি তা জানার জন্য | বদ্রীনাথের জঙ্গলে তাদের তপস্যা এতো কঠিন হয়ে চললো দিনের পর দিন যে স্বর্গের দেবতারা , দেবতাদের রাজা ইন্দ্র প্রমাদ গুনলেন |

ইন্দ্র বুদ্ধি বার করলেন ,” যাই ,যত তাড়াতাড়ি পারি ওদের কোনো বর দিয়ে তুষ্ট করে তপস্যা করা থেকে নিরত করি | আর যদি না করতে পারি , তবে হয়তো এরা আমার থেকেও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে |” এইসব ভেবে ইন্দ্র ওই দুই তপসীদ্বয়ের সামনে আবির্ভুত হলেন , ” চোখ খোলো বৎস,বোলো কি বর চাও ? তোমাদের তপস্যায় আমি সন্তুষ্ট |”
না , তপস্বী যুগল চোখ তো খুললোই না , হয়তো বা কানেও শুনলো না | ইন্দ্র আশ্চর্য হলো , দেবরাজ তখন বুঝতে পারেন নি ওনারা আসলে কোনো বরের জন্য না , শুধুমাত্র জ্ঞান লাভ করার জন্যই আনন্দে ধ্যান করে যাচ্ছেন |

ইন্দ্র আবারো বললেন ,” চোখ খোলো , বৎস্যরা |” তাঁকে আবারো হতাশ হতে হলো | মনে মনে ভাবলেন , ” কি এতো সাহস, দেবতাদের রাজা ইন্দ্রের কাছেও তোমাদের চাওয়ার কিছু নেই?” ক্রূদ্ধ হলেন, নিজের শক্তিতে কাছের জঙ্গলের সমস্ত জীবজন্তুদের ডেকে আনলেন আর নির্দেশ দিলেন তপস্বী যুগলকে আক্রমণ করতে | পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন কি হচ্ছে এবার |

ইন্দ্রের ধাক্কা খাওয়া আরো বাকি ছিল যখন তিনি দেখলেন ওই সমস্ত হিংস্র প্রাণীরা নিজেদের স্বভাব ভুলে তপস্বী দুজনের কাছে গিয়ে এমন করে বসে রইলো যেন তাদের পোষ্য | আসলে ওই ঋষিদের তপস্যার তেজ তাদের হিংস্র হতে ভুলিয়ে দিয়েছিলো | এইসব দেখেশুনে ইন্দ্র সত্যি এবার বেশ ভয় পেলেন | যদিও ওই ঋষিগণ ধ্যান ছাড়া কিছুই করছেন না তবুও তাদের তেজবলের প্রভাবে যে কোনোদিন ইন্দ্রের সিংহাসন হয়ে উঠতে পারে টলমল ,তখন ? তখন হয়তো আর কিছুই করার থাকবে না |এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে তিনি ফিরে এলেন স্বর্গে |

ইন্দ্র যেহেতু দেবতাদের রাজা তাই অনেক কিছুই আছে তার অধীনে , তাই আকাশের দেবতাকে তিনি আদেশ দিলেন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে | যত শক্তি আছে সব জড়ো করে মেঘ, বৃষ্টি, সাইক্লোন হয়ে আছড়ে পরতে বললেন সেই জায়গায় যেখানে নর আর নারায়ণ ঋষি তপস্যারত | ইন্দ্র হয়তো তখন এতটাই ভীত হয়ে গিয়েছিলো যে বুঝতেই পারছিলো না বাইরের আবহাওয়া ওই তপস্বী দ্বয় কে কোনোভাবেই ব্যস্ত করতে পারবে না | বাস্তবে হলোও তাই , মুনিদ্বয় কিছুই গ্রাহ্য করলো না , তপস্যায় কোনো বিঘ্ন হলো না তাদের |

ইন্দ্র ভাবলো বুঝি বা মুনীদ্বয় তার ক্ষমতাকে উপহাস করেছে , ক্রোধে অগ্নিরূপ হয়ে গেলেন ইন্দ্র | স্বর্গের সভায় নাচ-গানে তার মন নেই , হঠাৎ আর একটা উপায়ের কথা মনে এসে গেলো | স্বর্গের অপ্সরাগনের তো মনোহরণের ক্ষমতা থাকে , তাদেরকে কেউ ই উপেক্ষা করতে পারে না | ঋষি দুজনের সামনে নাচলে দেখবো কেমন করে তারা মনো সংযোগ ধরে রাখতে পারে | এই সব ভেবে ভালোবাসার দেবতা কামদেবকে ডেকে পাঠালেন তিনি | আদেশ দিলেন অপ্সরাগন আর গন্ধর্বদের নিয়ে গিয়ে মুনীদ্বয়ের ধ্যান ভাঙাতে |

ইন্দ্রের আদেশমত সকলে গেলেন তপস্যার জায়গায় , বসন্তের দেবতা চারিদিকে পাতা-ফুলের সমারোহে সুন্দর করে সাজিয়ে দিলো জায়গাটাকে | গন্ধর্বগণ নানারকম বাদ্য বাজাতে লাগলেন আর অপ্সরাগন নৃত্য করতে থাকলেন | পৃথিবীতেই যেন স্বর্গের সৃষ্টি হলো | হঠাৎ করে এই সময় ঋষি গণ চোখ খুললেন নিজেদের ধ্যান বন্ধ রেখে ,চারিদিকের সাজসজ্জা দেখে অবাক হয়ে গেলেন | সামনেই ছিলেন দেবতা কামদেব, নারায়ণ ঋষি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন ,” মহাশয়, এখানে কি হচ্ছে বলতে পারেন ?” কামদেব তো আনন্দে আটখানা, পরিকল্পনা সার্থক হয়েছে, গদগদ হয়ে উত্তর দিলেন, ” হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন “| ” এই সব মহিলারা কারা?”, জানতে চাইলেন মুনি | কামদেব বললেন ,” দেবরাজ ইন্দ্র আপনাদের আনন্দ দেবার জন্য পাঠিয়েছেন স্বর্গের অপ্সরাগনদের |”

মুনীদ্বয় একে অন্যের চোখ চাওয়া- চাওয়ি করলেন , এইসময় ঝোড়ো হাওয়ায় একটা ফুল এসে হঠাৎ করে পড়লো নারায়ণ ঋষির পায়ে | সেই ফুল তিনি নিজের উরুতে রাখলেন , সৃষ্টি হলো এক অতীব সুন্দরীর কন্যার | কামদেব দেখে অবাক হয়ে গেলেন , সেই সুন্দরী কন্যা স্বর্গের অপ্সরীদের থেকে এক কণাও কম সুন্দরী নয় | ঋষি নারায়ণ এবার কামদেবকে আদেশ দিলেন , ” এই কন্যাকে আপনার সাথে নিয়ে যান , স্বর্গে আমাদের ক্ষমতাবলে ইনি অনেক উত্তম নৃত্য করে দেবরাজের মনোরঞ্জন করবেন | যেহেতু আমার উরু থেকে এই কন্যার জন্ম তাই নাম হবে উর্বশী |” কামদেব বুঝতে পারলো এই ঋষিদ্বয় সমস্ত কামনা-বাসনা জয় করেছে , এদের মহাঋষি বলা যায় এখন | উর্বশীকে নিয়ে ফিরে গেলেন তিনি |

ঋষিদ্বয় যাঁর তপস্যারত তিনি এতক্ষন সব কিছুই খেয়াল রাখছিলেন | ভগবান শিব জানতেন বিষ্ণুর অংশে জন্ম নেয়া এই ঋষি দুজন অন্যরকম , খুবই ক্ষমতার অধিকারী যেকোনো লোভ সামলাতে | কিন্তু শুধু তিনি নিজে জানলেই তো হবে না,তাদের মাহাত্ম্য পৃথিবীতে প্রচার হওয়া দরকার | উপায় হিসাবে তিনি নিজের শক্তিশালী পাশুপত অস্ত্র নিয়ে ঋষিদের সামনে হাজির হলেন | যারাই দেখলো হায় হায় করে উঠলো ভয়ে , আশঙ্কায় , নাজানি কেন শিব ওই ভক্তদের প্রতি ক্রূদ্ধহয়ে উঠেছেন এই ভেবে |এই পৃথিবী কি ধ্বংস হয়ে যাবে ?

কিন্তু শিব হাসলেন, তিনি জানেন কি হতে যাচ্ছে | ঋষিদ্বয় একমনে ধ্যান করে চলেছে যেখানে , সেখানে নিক্ষেপ করলেন নিজের পাশুপত অস্ত্রকে | বিশ্ব অবাক হয়ে দেখলো তাদের তপস্যার কত ক্ষমতা , শিবের অস্ত্র তাদের কাছে এসে নিস্তেজ হয়ে গেলো | ঋষিদের গায়ে কোনো আঁচড় ও লাগাতে পারলো না , না ভঙ্গ হলো তাদের জ্ঞান লাভের জন্য করা ধ্যান | পাশুপত অস্ত্র ফিরে গেলো ভগবান শিবের কাছে , শিব ও হাসিমুখে অন্তর্ধান করলেন | নর ও নারায়ণ ঋষি পরিচিত হলো মহাঋষি হিসাবে |
কলিযুগে পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণ আর স্বামীজী বিবেকানন্দকে এই ঋষিদ্বয় নর ও নারায়ণের পুনর্জন্ম বলে মনে করা হয় যাঁরা শুধু যুগে যুগে জ্ঞান লাভ করতে আর বিতরণ করতে বার বার জন্ম নেন |

Tagged ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →