mythology

বিষ্ণুর দশ অবতারের কারণ

সৃষ্টির পালনকর্তা হলেন ভগবান বিষ্ণু | পৃথিবী থেকে পাপ নাশ করতে, ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে সময়ে সময়ে তিনি অবতার রূপে জন্ম নিয়েছেন |

প্রথম অবতার : মৎস্য – হিন্দু ধর্মের সৃষ্টির আগে, চার বেদ রচনা হবার আগে এমনকি এই মহাবিশ্বের উৎপত্তির আগে এই অবতারের জন্ম | সৃষ্টির আগেই যাতে তা অসুরদের হাতে না গড়ে ওঠে তাই বহ্মার উপদেশে মৎস্য হয়ে জন্ম গ্রহণ করেন | বৈবস্বত মুনিকে সঙ্গে নিয়ে বেদের সংরক্ষণ করেন ও এই প্রাণীকুলের সৃষ্টি গড়ে তোলেন |

এই অবতারের কারণ – জীবন শুরু হয় জল থেকেই , জল ছাড়া বাঁচা ও যায় না |আর মাছ জলের ই প্রাণী |

মাছ যেমন জলের স্রোতের বিপরীতে গিয়েও জীবনের উদেশ্য বলে সেরকম সাধারণ মানুষদের ও ভোলা উচিত নয় কি জন্য এই মানব জন্ম |

দ্বিতীয় অবতার – কুর্ম/ কচ্ছপ – এই সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন হয়ে পরে অমৃত মন্থনের | মন্দার পর্বত দ্বন্দ্ব আর শেষনাগের রজ্জু হয়ে ওঠে সমুদ্র মন্থনের সময় , দেবতা আর অসুররা হন অমৃতের ভাগিদার | কিন্তু এই মহান কাজের সময় এমন কাউকে চাই যার উপর মন্দার পর্বত তার ভার দিতে পারে | সেই সময় বিষ্ণু ভগবান এক কুর্মের রূপে সেই সমস্ত ভার গ্রহণ করেন নিজের শরীরের উপর আর সৃষ্টি কে রক্ষা করেন এই ভাবে |

এই অবতারের কারণ – কচ্ছপ এমন এক প্রাণী যা জলেও থাকতে পারে আবার স্থলে ও | জীবন যেরকম চক্রাকারে এগিয়ে চলে সেই রকমই জীবজগতের ও এই বিবর্তন |
অন্যদিকে কচ্ছপ দরকারে নিজের চার পা খোলের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয় সহজেই তেমনি আমাদের ও কন্ট্রোলে রাখা দরকার আমাদের ছয় রিপুকে |

তৃতীয় অবতার – বরাহ অবতার , শূকর | হিরণ্যাক্ষ অসুর তপস্যার দ্বারা ব্রহ্মাকে সন্তুষ্ট করে এক অনন্য বর পেয়ে যান , তাহলো এই বিশ্বে তিনি অজেয় থাকবেন | অহংকারে মত্ত হয়ে তখন শক্তিশালী হিরণ্যাক্ষ পৃথিবীকে সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে ফেলার চেষ্টা করেন | সেই সময় এই বসুন্ধরাকে বাঁচাতে বরাহের রূপ ধরে ভগবান বিষ্ণু অসুরকে হত্যা করেন |

এই অবতারের কারণ – বন্য শুকরের অবতার ছিল এমন এক প্রাণীর যার কোনো বুদ্ধি নেই কিন্তু খুব শক্তিশালী | কিন্তু নিজের কাজে অদম্য , মৃত্যু ও বোরন করে নিতে পারে সেটা সার্থক করতে |
মানুষকেও নিজেদের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য এমনি জেদি হয়ে কাজ করে যেতে হয় , মৃত্যুভয় না রেখে |

চতুর্থ অবতার – নৃসিংহ অবতার | ভগবান ব্রহ্মার বরে অসুরদের রাজা হিরণ্যকশিপু মহা পরাক্রমী হয়ে ওঠেন | তিনি বরপ্রাপ্ত হন যে না কোনো প্রাণী , না কোনো মানুষের হাতে তার মৃত্যু হবে | অসুর হিরণ্যকশিপু ক্ষমতার অপব্যবহার করতে থাকেন আর সেই সময় তার ঘরে জন্ম হয় তারই সন্তান বিষ্ণু ভক্ত প্রহ্লাদের | ভক্তকে বাঁচাতে আর অসুরকে নিধন করতে বিষ্ণু রূপ ধরেন এমন এক প্রাণীর যার অর্ধ ভাগ মানুষের আর বাকি অর্ধেক সিংহের |

এই অবতারের কারণ- নৃসিংহ অবতার ছিল কিছুটা প্রাণী আর কিছুটা মানুষের দেহের , এখানে বন্য প্রাণী থেকে মানুষের বিবর্তন বোঝা যায় , এই প্রাণীর বুদ্ধিও ছিল |
হিরণ্যকশিপু হলো মানুষের অজ্ঞানতা , ভগবান যে সব জায়গা তাই আছে সেটা সে ভুলে যায় | তাইতো ভগবানকে নাভিমণ্ডল চিরে কুণ্ডলিনীকে জাগিয়ে দিতে হয় |

পঞ্চম অবতার – বামন অবতার | অসুর বালি নিজেকে শক্তিশালী করে স্বর্গ, মর্ত্য আর পাতালের অধীশ্বর বানিয়ে নিয়েছিলেন | সঙ্গে সঙ্গে হয়ে উঠেছিলেন খুব অহংকারী , তবে তিনি খুব দানবীর ও ছিলেন | বিষ্ণু ভগবান একজন বামনের অবতারে তার কাছে গিয়ে শুধু তার তিন পায়ের মাপের জমি চান , বালি তা দিতে সম্মত ও হন | এক পা আকাশে, এক পা পৃথিবীকে ঢেকে যখন আর এক পা রাখার জায়গা পাচ্ছিলেন না তখন সেই পা অসুর বালির মাথায় দিয়ে তাকে পাতালে পাঠিয়ে দেন তিনি | তার প্রাণ বাঁচিয়ে তাকে পাতালের রাজা করে দেন |

এই অবতারের কারণ- বামন অবতার মানুষের আকৃতি ছোট কিন্তু বুদ্ধিমান | অহঙ্কারী বালি রাজাকে নিজের কথাতেই বন্দি করে ফেলে |
আর আকাশ, পৃথিবী আর মহাকাশে নিজের পা রেখে জানিয়ে দেয় ভগবানের কত বড়ো অস্তিত্ব হতে পারে |

ষষ্ঠ অবতার – পরশুরাম অবতার | জমদগ্নি ঋষি আর রেণুকা পুত্র পরশুরামের আসল নাম হলো জম্যাগ্নেয়া কিন্তু তিনি পরস্ব অর্থাৎ কুঠার ব্যবহার করতেন অস্ত্র হিসাবে তাই এই নাম | পৃথিবীতে ক্ষত্রিয় রাজারা সাধারণ মানুষ, ঋষিদের উপর অত্যাচার শুরু করলে তিনি পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয় করে ছাড়েন | তিনি শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর ও ছিলেন |

এই অবতারের কারণ- পরশুরাম অবতার ছিল একজন শক্তিশালী মানুষের যিনি জঙ্গলে,গুহায় বাস করেন কিন্তু সামাজিক প্রাণী হয়ে ওঠেন নি | কিন্তু চার বেদের পাঠকারী তিনি একজন ভালো গুরু ছিলেন | ধনুর্বিদ্যায় ও অতুলনীয় ছিলেন | জীবনে বেঁচে থাকতে হলে বুদ্ধিশালী আর শক্তিশালী দুটোই সমান মাত্রায় হওয়া দরকার তা এই অবতার শিখিয়ে দেয় |

সপ্তম অবতার – রাম অবতার | এই অবতারে ভগবান বিষ্ণু ছিলেন সত্য আর ন্যায়ের অনুবর্তী | এই জন্মের কারণ ছিল অধর্মের প্রতীক অসুর রাবনকে বধ করা | রাম-রাবনের ভীষণ যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি পৃথিবীতে ন্যায় আর সত্যের প্রতিষ্ঠা করেন |

এই অবতারের কারণ- রাম অবতার মানুষকে ন্যায়-নীতি শেখায় , সমাজে বসবাসের উপযুক্ত করে গড়ে তোলে | অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে ,মানুষ হিসাবে তিনি অনেক পরিণত সাথে অন্য প্রাণীকুলের সাথেও তার বন্ধুত্ব |

অষ্টম অবতার – কৃষ্ণা অবতার | যদিও এই অবতারে তার উদেশ্য ছিল কংস অসুরকে বধ করা কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি কুরু আর পাণ্ডবদের যুদ্ধে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন ধর্মের রক্ষার জন্য| সাথে সাথে তার মুখ নিঃসৃত দার্শনিক কথা যা মানবতা লেভার সোপান তা ” গীতা” রূপে আজ ও আমাদের পথ প্রদর্শক |

এই অবতারের কারণ- ভগবান কৃষ্ণ রাজনীতিজ্ঞ, ধর্মের জন্য আপাত দৃষ্টিতে অনেক অনুচিত কাজ ও করেন কিন্তু সেগুলো সব কিছুই গভীর অর্থবাহক | তিনি মানবতায় বিশ্বাসী এক প্রকৃত প্রেমিক তাইতো তার মুখ নিঃসৃত ” গীতা ” জীবনের পাথেয় আমাদের |

নবম অবতার – বুদ্ধ অবতার | বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা যদিও তিনি শুধু চেয়েছিলেন সমগ্র মানবজাতিকে এটা শেখাতে যে নিজেদের সঠিক নীতিবোধ আর ভগবানের ধ্যান সর্বদা হৃদয়ের মধ্যে করে যে কেউ ঈশ্বরত্ব অর্জন করতে পারেন | তার জীবন পথ মানুষকে শান্তির রাস্তায় যাবার অনুপ্রেরণা দেয় |

এই অবতারের কারণ – বুদ্ধ অবতার মানুষকে শান্তির খোঁজে অভিযাত্রী করে তোলে | সমস্ত অস্ত্র ফেলে শুধুমাত্র ভালোবাসা দিয়েই সবকিছু জয় করা যায় , তাই আমাদের শেখায় |

দশম অবতার- কল্কি অবতার | কল্কি যুগের শেষে , অনেক অনেক অধর্মের মাঝে আবার নতুন করে মানুষের মনে ধর্ম ভাবকে জাগরিত করতে এই অবতার রূপে আসবেন ভগবান বিষ্ণু | কল্কি যুগের ৪ ,৩২ ,০০০ বছরের মধ্যে আমরা এখন মাত্র ৫০০০ বছর অতিক্রম করেছি | সাদা ঘোড়া চড়ে, হাতে তরোয়াল নিয়ে এই অবতারে তিনি আবার বেদে বর্ণিত নীতিসমূহের পুনঃ প্রতিষ্ঠা করবেন |

এই অবতারের কারণ- কল্কি অবতার আসবে কল্কি যুগের শেষে ,হাতে তরোয়াল নিয়ে যা আমাদের অন্তিম পরিণতির আগাম ইঙ্গিত |

Tagged , ,

About Antara Samanta

Myself is Antara Samanta, a wanna be writer in homemaking style with an idea to embrace the indifference in a classy dynamic way. Antara is passionate about reading,singing and writing-in that way.
View all posts by Antara Samanta →